কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা, গায়ক এবং সঙ্গীত পরিচালক মুন্সিগঞ্জের সন্তান টেলিসামাদ
1

মুন্সিগঞ্জ, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

বাংলা চলচ্চিত্রে কৌতুকের সঙ্গে যে কয়েকটি নাম দীর্ঘদিন ধরে সমার্থক হয়ে আছে, টেলি সামাদ তাঁদের অন্যতম। মুখের অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন, শরীরী ভাষা আর সহজাত রসবোধ দিয়ে কয়েক দশক ধরে তিনি দর্শকদের হাসিয়েছেন। তবে তাঁর পরিচয় শুধু কৌতুক অভিনেতা হিসেবে নয়—তিনি ছিলেন গায়ক, সঙ্গীত পরিচালক এবং চারুশিল্পীও। আর এই বহুমুখী প্রতিভার মানুষটির শেকড় মুন্সিগঞ্জের মাটিতে।

টেলি সামাদের প্রকৃত নাম আবদুস সামাদ। ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামে তাঁর জন্ম। সেখানেই কেটেছে তাঁর শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময়। পরবর্তীকালে ঢাকায় শিল্পীজীবন গড়ে তুললেও নিজের গ্রামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। মৃত্যুর পরও তাঁর শেষ ঠিকানা হয়েছে সেই নয়াগাঁও।

টেলি সামাদের পারিবারিক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন টেলি সামাদের চাচা।

টেলি সামাদের বড় ভাই ছিলেন বিশিষ্ট চারুশিল্পী আবদুল হাই। বড় ভাইয়ের শিল্পীসত্তার প্রভাবও তাঁর জীবনে পড়েছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়াশোনা করেন তিনি। কিন্তু ক্যানভাসের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র।

অভিনয়ের শুরুটাও হয়েছিল মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে। স্থানীয়ভাবে মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মঞ্চে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে। পরে সেই পথ ধরেই তিনি চলে আসেন টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে।

‘টেলিসামাদ’ নামটিও তাঁর অভিনয়জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। আবদুস সামাদ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন সবার পরিচিত টেলি সামাদ। নামটির সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তা এমনভাবে মিশে যায় যে একসময় প্রকৃত নামের চেয়ে পর্দার নামেই তাঁকে বেশি চিনত মানুষ।

১৯৭৩ সালে ‘কার বউ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক। এরপর চার দশকের অভিনয়জীবনে তিনি প্রায় ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোট-বড় নানা চরিত্রে অভিনয় করলেও কৌতুক চরিত্রেই তিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পান।

টেলি সামাদকে দর্শক মূলত কৌতুক অভিনেতা হিসেবেই মনে রেখেছেন। কিন্তু তাঁর প্রতিভার পরিধি ছিল আরও বড়। তিনি গান গেয়েছেন বহু চলচ্চিত্রে। ‘মনা পাগলা’ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন। অর্থাৎ অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীতেও ছিল তাঁর সক্রিয় পদচারণা।

তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। কৌতুককে কেবল সংলাপের মধ্যে আটকে না রেখে তিনি ব্যবহার করতেন অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি ও কণ্ঠের ওঠানামা। ফলে পর্দায় তাঁর উপস্থিতি অনেক সময়ই আলাদা এক আবহ তৈরি করত।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যখন সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে দর্শকপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছিল, তখন সেই সময়ের অসংখ্য চলচ্চিত্রে টেলি সামাদ ছিলেন পরিচিত মুখ। তাঁর অভিনয় প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শককে বিনোদন দিয়েছে।

জীবনের শেষদিকে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও নিজের গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অটুট। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তার বাইপাস সার্জারি করা হয়। ২০১৮ সালের শেষ দিকে তার রক্তে লোহিত রক্তকণিকার স্বল্পতা দেখা দেয়। এছাড়াও টেলি সামাদের খাদ্য নালীতে সমস্যার পাশাপাশি বুকে সংক্রমণ এবং ডায়াবেটিস ছিল। ২০১৮ সালে শেষবার তিনি নয়াগাঁওয়ের গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান টেলি সামাদ। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ নিয়ে আসা হয় মুন্সিগঞ্জের নয়াগাঁওয়ে। বাদ আসর সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

আজ তিনি নেই। নেই তাঁর সেই স্বতন্ত্র হাসি, নেই পর্দায় সেই চেনা মুখভঙ্গি। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে টেলি সামাদের নাম এখনো আলাদা করে উচ্চারিত হয়। নিজের শিল্পীসত্তা দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের কোটি দর্শকের মনে।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ