১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বৃহস্পতিবার | সকাল ১১:৪১
মুন্সিগঞ্জের উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র সরকারি হরগঙ্গা কলেজ: গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ৮৬ বছর
খবরটি শেয়ার করুন:
275

মুন্সিগঞ্জ, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

মুন্সিগঞ্জের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাতিঘর হিসেবে পরিচিত সরকারি হরগঙ্গা কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত বাংলায় যে উচ্চশিক্ষার বীজ বপন করা হয়েছিল, আজ তা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠা ও নামকরণের নেপথ্যে

মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার রাউতভোগ গ্রামের এক মহৎপ্রাণ ব্যক্তি শ্রী আশুতোষ গাঙ্গুলী এই জনপদে শিক্ষার আলো ছড়াতে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তাঁর এই মহতী উদ্যোগে সে সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তৎকালীন মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব এ.এইচ.এম ওয়াজির আলী এবং বিশিষ্ট আইনজীবী সতীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য। আশুতোষ গাঙ্গুলী তাঁর পিতা হরনাথ গাঙ্গুলী ও মাতা গঙ্গাশ্বরী দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের নামের আদ্যক্ষর মিলিয়ে কলেজের নাম রাখেন ‘হরগঙ্গা কলেজ’।

১৯৩৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কলেজটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৩৯ সালে শ্রী বিরেন্দ্র মুখার্জীকে প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিবর্তন প্রতিষ্ঠাকালে শ্রী আশুতোষ গাঙ্গুলী নিজে এক লক্ষ রুপী অনুদান প্রদান করেন, যা পরবর্তীতে আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৪২ সালে তাঁর সম্মানে কলেজের অডিটোরিয়ামের নামকরণ করা হয় এবং একটি বিশাল ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। অন্যদিকে, মুসলিম শিক্ষার্থীদের আবাসনের কথা চিন্তা করে লৌহজংয়ের কলমা এলাকার দানবীর মোহাম্মদ আলী সিনহা ১০ হাজার রুপী অনুদান দেন, যার মাধ্যমে নির্মিত হয় ‘আলী সিনহা ছাত্রাবাস’। ষাটের দশকে প্রখ্যাত নাট্যকার ও তৎকালীন অধ্যক্ষ আযীম উদ্দিন আহমেদ (অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের পিতা) কলেজ প্রাঙ্গণে একটি মসজিদ ও ব্যায়ামাগার স্থাপন করে এর শ্রী বৃদ্ধি করেন। ১৯৮০ সালের ১লা মার্চ কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়।

সময়ের সাথে সাথে কলেজের অবকাঠামোতে যুক্ত হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। ২০০০ সালে নির্মিত হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাডেমিক ভবন। এর আগে ১৯৯৫ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছাত্রাবাস এবং পরবর্তীতে জগদীশ চন্দ্র বসু বিজ্ঞান ভবন ও ছাত্রীদের জন্য তাপসী রাবেয়া বসরী নিবাস নির্মিত হয়। ২০০১ সালে তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর আয়েশা শিরিন ক্যাম্পাসে ‘মাতৃছায়া’ নামক তিনটি নান্দনিক ছাতা স্থাপন করেন, যা বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রিয় স্থান। এছাড়াও ২০০৮ সালে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বাস উপহার দেন।

বর্তমানে সরকারি হরগঙ্গা কলেজ মুন্সিগঞ্জ জেলার সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চালু হয়। এখন ১৭টি বিষয়ে স্নাতক ও ৯টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু আছে। ২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক ও ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আছেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে। শিক্ষক আছেন ৮৩ জন।

গত কয়েক বছরের তুলনায় পরীক্ষার ফলাফলের দিক দিয়ে এগিয়েছে হরগঙ্গা কলেজ। বছর পাঁচেক আগেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫০-৬০ শতাংশ। এখন পাসের হার ৭৫-৮০ শতাংশ।

কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও মুন্সিগঞ্জ তথা সারা দেশে বিশেষ সুনাম রয়েছে সরকারি হরগঙ্গা কলেজের। শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তুলতে ক্যাম্পাসে সক্রিয় রয়েছে রেড ক্রিসেন্ট, রোভার স্কাউট এবং বিএনসিসি-র মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। সৃজনশীল চর্চায় প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসটিতে রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সংগীত চক্র’, যেখানে শিক্ষার্থীদের সুর ও তালের মেলবন্ধন ঘটে। পাশাপাশি আধুনিক ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে কলেজের ‘বিজ্ঞান ক্লাব’।

সাফল্যের এই ধারা বিস্তৃত হয়েছে ক্রীড়াঙ্গন ও মেধা যাচাইয়ের মঞ্চেও। ২০২৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টনে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করে কলেজের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারের মাধ্যমে কলেজটির গৌরবের মুকুটে প্রতিনিয়ত নতুন পালক যুক্ত হচ্ছে।