১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
মঙ্গলবার | সন্ধ্যা ৬:১১
বিভুরঞ্জন সরকারই হালের সাংবাদিকতার ছবি: সাংবাদিক শিহাব আহমেদ
খবরটি শেয়ার করুন:
325

মুন্সিগঞ্জ, ২৩ আগস্ট ২০২৫, (আমার বিক্রমপুর)

লেখক: সাংবাদিক শিহাব আহমেদ

সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার বর্তমান চিত্র জানেননা এ কথা সাধারণ পাঠক/দর্শক বুঝতে না চাইলেও, বুঝতে না পারলেও যিনি সাংবাদিকতায় আছেন, সৎ সাংবাদিকতা করছেন বিশেষ করে বর্তমান ‘ট্যাগিং’য়ের সময়েও। তিনি মাত্রই ঠিকই অনুধাবন করেন সাংবাদিকতা চিরায়ত ধারায় নেই। কেন নেই- সেটা অনেক কারনেই নেই।

একদিকে যেমন যথাযথ বেতন নেই, সম্মান নেই, যোগ্যতার মূল্যায়ন নেই অন্যদিকে নেই সত্য লেখার পরিবেশ। সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার তাই তার ‘শেষ লেখা’য় লিখেছেন ‘সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়।’ এখানে সত্য লিখে মৃত্যুর দিকে চলে যাওয়াই শুধু তিনি বোঝাতে চাননি। তিনি বলতে চেয়েছেন- সত্য লিখে লড়াই করা এবং টিকে থাকা সহজ নয়। সত্য লিখে মামলার রোষানল, মানসিক আক্রমণ, সামাজিকভাবে একত্রিত হয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা ইত্যাদি ঘটনাগুলো এখনো বিরাজমান। কোন কোন ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়ানো।

বিভুরঞ্জন লিখে গেছেন, ‘অনেকেই সুবিধা, স্বার্থ, সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক স্বার্থের জন্য সত্যকে আড়াল করে লেখেন।’ তার এ কথার সাথে কোনভাবেই দ্বিমত নেই। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও নামধারী সাংবাদিকদের মধ্যে এই চরিত্র বজায় ছিলো, এমনকি ছিলো ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালানোর সময়েও।

এখনো এক শ্রেণীর সাংবাদিক আছেন, তারা স্রোতের অনুকুলে চলে স্বাধীন সাংবাদিকতার মানহানি করছেন।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সাংবাদিকতা যে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে আছে তা নিখুতভাবে অনুধাবন করেছেন বিভুরঞ্জন। তিনি লিখেছেন, ‘এর মধ্যে গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের অবস্থা আরও কাহিল হয়েছে। মন খুলে সমালোচনা করার কথা প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন। কিন্তু তার প্রেস বিভাগ তো মনখোলা নয়। মিডিয়ার যারা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন তারা সবাই আতঙ্কে থাকেন সব সময়। কখন না কোন খবর বা লেখার জন্য ফোন আসে। তুলে নিতে হয় লেখা বা খবর! এর মধ্যে আমার একটি লেখার জন্য ‘আজকের পত্রিকা’র অনলাইন বিভাগকে লালচোখ দেখানো হয়েছে। মাজহারুল ইসলাম বাবলার একটি লেখার জন্যও চোটপাট করা হয়েছে। আপত্তিকর কি লিখেছেন বাবলা?’

বিভুরঞ্জনের ‘খোলা চিঠি’র অংশটি যে বাস্তব সত্য তা সাধারণ পাঠক/দর্শক না বুঝলেও গণমাধ্যমে কর্মরত সারাদেশের সাংবাদিকরাই মেনে চলছেন। বিশেষ করে বড় গণমাধ্যমগুলোতে কর্মরত সাংবাদিকরা। তাদের চলতে হচ্ছে নানা লিয়াজু , স্রোতের সাথে মিশে থেকে। যেমনটা অনেককে করতে হয়েছে আগেও। যারা স্বভাবগত তাদের প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও যারা স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতায় আগ্রহী তাদের মানসিক অবস্থা বর্তমানে কোনভাবেই স্বাভাবিক নেই।

পূর্বে যেখানে প্রতি লাইনের জন্য ভাবতে হতো-এখন সেখানে প্রতি শব্দের জন্য ভাবতে হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নামে যেভাবে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছিলো এখন সেই মামলার ‘অস্ত্র’ ব্যবহৃত না হলেও সাংবাদিকের উপর হামলা করে, সম্মানহানির ভয় দেখিয়ে, ট্যাগিং করে ভয় দেখানোর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এবং এর সাথে যারা জড়িত তারা স্বাচ্ছন্দ্যেই নিজেদের ‘প্রভাবশালী’ হিসাবে সমাজে পরিচিত করে তুলেছেন। যার ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা এখনও অধরা।

সাংবাদিকরা ‘সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে লিখেন- বিভুররঞ্জনের এমনই দর্শন। তিনি বলে গেছেন- ‘আমার পেশা আমাকে শিখিয়েছে—সত্য প্রকাশ করা মানে সাহসের সঙ্গে ঝুঁকি নেবার নাম।’ কিন্তু ঝুঁকি কি সাংবাদিকরা এখন নিচ্ছেন? কেন নিচ্ছেন না? কারণ তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই- করা হয়নি। আগের সকল সরকারের মত এই সরকারও করেনি। তারা ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ করেছিলো কিন্তু তার কোন সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। কমিশন সাংবাদিকতার সুরক্ষার জন্য আইন প্রস্তাব করেছিলো। সরকার ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ করার পরিকল্পনা করেছে। এই আইন কিসের জন্য? শুধু কি প্রভাবশালীদের হাত থেকে রক্ষা? না- এটি গণমাধ্যমকে যারা ব্যবসা হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং করছেন তাদের কাছ থেকেও ‘ন্যয্য অধিকার’ আদায় করার জন্য।

বিভুরঞ্জন যে তাদের দ্বারাও আক্রান্ত ছিলেন তাও বলেছেন,-‘আজকের পত্রিকা’য় কাজ করছি ৪ বছর হলো। এই সময়ে না হলো পদোন্নতি, না বাড়ল বেতন। অথচ জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে প্রতিদিন। সংবাদপত্র আর কীভাবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে, ঘরের মধ্যেই যেখানে অনিয়ম।’

আসলে বিভুরঞ্জনের এই ‘খোলা চিঠি’ কত সময় নিয়ে লেখা তার চেয়েও আলোচ্য বিষয় কতকালের কষ্ট এখানে লেখা। আরও কি কিছু আছে যা তিনি বলেননি? বলেছেন তো! ছেলের অসুস্থতা, মেডিকেল পাস সরকারি কর্মকর্তা মেয়ের উচ্চতর পরীক্ষায় ‘ফেল করা’, বুয়েটে থেকে পাস করা ছেলের ‘চাকরি না হওয়া’ নিয়েও।

এই আক্ষেপ/আকাঙ্ঘাগুলো বর্তমান সময়ের সাংবাদিকদেরই। হ্যা, আমাদেরই। খুব বড় পদে আসীন সাংবাদিক ছাড়া বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের অনেকেই তাদের সন্তানদের মেডিকেলে পড়াবেন বা উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করবেন এটা তাদের কাছে স্বপ্নের মত। অর্থাৎ এটি একজন সৎ সাংবাদিকের জন্য কোন স্বাভাবিক বিষয় নয়। অথচ তারও এই অধিকার রয়েছে।

বিভুরঞ্জন সরকার বলে গেছেন- ‘দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।’ সরকারের প্রতি আহবান- দুঃখ আর কোন সাংবাদিকের জীবনের শেষ সঙ্গী না হোক। নিশ্চিত হোক সাংবাদিকদের অধিকার।

ফেইসবুকে আমরা
ইউটিউবে আমরা