বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান, সাহিত্যসেবী আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ
মুন্সিগঞ্জ, ৪ জুলাই ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, সাহিত্যসেবী ও শিক্ষানুরাগী আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরীর ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ৪ জুলাই। ১৯৮৭ সালের এই দিনে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ঢাকার পিজি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। তিনি ছিলেন চিরকুমার। তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী শোক প্রস্তাব উপস্থাপন ও মোনাজাত পরিচালনা করেন।
আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী বাংলা ১৩০০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে, মতান্তরে ১৮৯৩ সালের ৫ মার্চ মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার কোর্টগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম কাজী ইব্রাহীম হোসেন ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী, দানশীল ও প্রভাবশালী তালুকদার এবং মাতা এলেমজান বিবি ছিলেন গৃহিণী।
তিনি ১৯১৫ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে লেখাপড়া শেষ করেন। পরে কলকাতায় গিয়ে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। সেখানে মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সম্পাদিত ‘সুলতান’ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর লেখা ‘প্রবাসী’, ‘সওগাত’, ‘মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা’, ‘সাধনা’, ‘মোহাম্মদী’, ‘ভারতবর্ষ’সহ তৎকালীন বিভিন্ন খ্যাতিমান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। মুন্সিগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারসহ বহু খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও মনীষী অংশ নেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তাঁর অনুরোধেই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলিম সমাজের প্রেক্ষাপটে তাঁর কালজয়ী গল্প ‘মহেশ’ রচনা করেন।
আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী ছিলেন শিক্ষাবিস্তার আন্দোলনের একজন অগ্রদূত। নিজের অর্থায়নে ও উদ্যোগে বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং অসংখ্য দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে নিজ বাড়িতে রেখে বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগ করে দেন। তাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে কাজী কমরুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমান কে. কে. সরকারি বিদ্যানিকেতন), কোর্টগাঁও উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, চর ডুমুরিয়া এম. স্কুল, কোর্টগাঁওয়ের দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গজারিয়ার ভবেরচর হাই স্কুল, চিতলিয়া এম.ই. স্কুল ও সৈয়দপুর মাদ্রাসা। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তাও ছিলেন তিনি।
তিনি ‘বিক্রমপুরের কথা’ গ্রন্থ প্রণয়নে ঐতিহাসিক যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তকে সহযোগিতা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সাহিত্যকথা’, ‘চীনে ইসলাম’ ও ‘ফুলের ডালি’। তাঁর সম্পাদনায় ‘গ্রামের কথা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশিত হতো।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল ও সৎ নেতৃত্বের অধিকারী। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালেও পুনর্নির্বাচিত হয়ে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত আইনসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে প্রজাস্বত্ব আইন, শিক্ষা আইন, মাদ্রাসা শিক্ষা আইন, ঋণ সালিশী বোর্ড আইন, মহাজনী উচ্ছেদ আইন ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তিসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নানা সমস্যা জাতীয় পরিষদে তুলে ধরেন।
ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৪৬ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কনভেনশনে বাংলা প্রদেশের প্রতিনিধি হিসেবেও অংশ নেন। ১৯৫৯ সালে তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক গভর্নরের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন ১৯৮৩ সালে তাঁকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে।
রাজনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজসেবায় বহুমাত্রিক অবদানের মাধ্যমে আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী আজও বিক্রমপুর তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর স্মৃতিচারণ করছে।









