জোটে ‘ইনসাফ না পেয়ে’ একক ভোটের ঘোষণা ইসলামী আন্দোলনের
মুন্সিগঞ্জ, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্ট (আমার বিক্রমপুর)
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বাকি ৩২ আসনে অন্যদের সমর্থন দেবে দলটি।
জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘ইনসাফের দিক থেকে বঞ্চিত হওয়া’ এবং ‘ইসলামের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া’র কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।
তিনি বলেছেন, “আমরা আজকে আপনাদের সামনে ঘোষণা দিতে বাধ্য হচ্ছি যে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ২৭০টি আসনে মনোনয়নপত্র সাবমিট করেছে, এর মধ্যে আপিলে ২জন বাতিল হয়েছে; বাকি ২৬৮ জন সংসদ সদস্য প্রার্থী এখনো পর্যন্ত মাঠে কাজ করছেন। আমরা তাদেরকে নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি তারা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, একজনও তারা মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করবেন না।”
শুক্রবার বিকালে পুরানা পল্টনের নোয়াখালী টাওয়ারে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। দলের আমির সৈয়দ রেজাউল করিমের ‘আদেশে’ এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের কথা বলেছেন মুখপাত্র।
আতাউর রহমান বলেন, “যদিও আমরা জানি, সামনে আমাদের পথ চলা হয়তো মসৃণ নাও হতে পারে; কারণ আমরা ক্ষমতার রাজনীতি আমরা সেভাবে করি না। আমাদের মূল লক্ষ্য ইসলাম। ইসলামকে আমরা আগে রাখি। আমাদের নীতি-আদর্শের রাজনীতি করি। আর এখানে আমরা দেখছি যে, নীতি আদর্শের প্রশ্নে, রাজনৈতিক প্রশ্নে, ইনসাফের প্রশ্নে আমরা বৈরিতার শিকার হয়েছি।”
তিনি বলেন, “আমরা যেহেতু এবাদতের রাজনীতি করি, আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের সাথে প্রতারণা করতে পারি না। আমরা এদেশের ইসলামপন্থি জনতার আবেগের সাথে কিছুতেই প্রতারণা করতে পারি না।
“আমরা যেহেতু ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য, ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য, ইসলামের আলোকে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ এখানে কাজ করে আসছি—আমরা এ থেকে বিচ্যুত হতে পারি না।”
আতাউর রহমান বলেন, “এজন্য আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে গতকালকে ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে যেখানে আমরাও ছিলাম, সেখানে একটি সাংবাদিক সম্মেলন হয়েছে- সেখানে আসন বণ্টন হয়েছে। সেখানে আমাদের এই যে দীর্ঘদিনের পথচলা, ৫ অগাস্ট পরবর্তী সারা দেশে আমরা ইসলামপন্থি শক্তি একসাথে করার জন্য যে চেষ্টা, সাধনা করেছিলাম; আমরা দেখেছি যে শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের যে লক্ষ্য ছিল, সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এ যুগ্ম মহাসচিব বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান—তিনি বিএনপি প্রধান জনাব তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ শেষে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তারা নির্বাচন পরবর্তী জাতীয় সরকার, বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠন করবেন এবং বেগম খালেদা জিয়া যে ঐক্যের পাটাতন তৈরি করে গেছেন, সেই ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
“… যেহেতু আমরা তাদের (বিএনপির) প্রতিদ্বন্দ্বী, একটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সাথে গিয়ে উনি নিজে ঘোষণা দিয়ে আসলেন—তিনি জাতীয় সরকার করবেন; তাদের ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তাহলে এখানে আমাদের সাথে তো বিষয়টা তিনি ডিসকাস করেন নাই, অন্যান্য শরিকদের সাথে… তিনি এককভাবে ঘোষণাটা দিয়ে আসলেন।
“এখন আমাদের শঙ্কা হলো যে, এখানে নির্বাচনের আগেই যেহেতু একটা সমঝোতা-সমন্বয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সাথে হয়ে যাচ্ছে; তাহলে এই নির্বাচনটা আসলে পাতানো নির্বাচন হবে কি না। এটা কি ইলেকশন হবে, নাকি সিলেকশন হবে—এই শঙ্কাটাও আমাদের সামনে চলে এসেছে।”
ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র আতাউর বলেন, “আমাদের যেহেতু ২৬৮ আসনে ক্যান্ডিডেট আছে, আর ৩২ টা আসন এখনো ফাঁকা আছে; এই ৩২ আসনেও আমরা সমর্থন দিব। সেখানে কাদেরকে আমরা সমর্থন দিব, সেটা আমরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পরে ডিসাইড করব।
“আমাদের নীতি-আদর্শ এবং লক্ষ্যের সাথে যাদের মিল হবে, তাদের সাথে সৎ, যোগ্য ক্যান্ডিডেট—তাদেরকে আমরা ইনশাআল্লাহ সমর্থন দিব। এবং আমরা আশাবাদী গোটা বাংলাদেশে ৩০০ আসনেই আমাদের পক্ষের ক্যান্ডিডেট থাকবে ইনশাআল্লাহ, যাতে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের ইসলামের পক্ষে ‘ওয়ান বক্স নীতি’, সেটার যাতে সঠিক বাস্তবায়ন আগামী নির্বাচনে থাকে, এই জন্য আমরা ইনশাআল্লাহ এই ব্যবস্থা আমরা করব।”
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আশরাফুল আলম, সহকারী মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাইয়ুম, কে এম আতিকুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ইফতেখার তারিক, দপ্তর সম্পাদক লোকমান হোসেন জাফরি, প্রচার ও দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আপিল নিষ্পতির ধাপে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২০ জানুয়ারি প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বে যে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গড়ে ওঠে, তার সূচনা ঘটে ধর্মভিত্তিক আট দলের যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে শুরু হয়েছিল সেই যুগপৎ আন্দোলন।
শুরুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ছিল এই মোর্চায়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই মোর্চাকে নির্বাচনি জোটে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এলডিপি এবং তার পরদিন এবি পার্টি এই জোটে যোগ দেয়।
কিন্তু ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল এনসিপির জোটে আসা নিয়ে আপত্তি তোলে। শেষ পর্যন্ত মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে রাজি করানো গেলেও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত জোটের দূরত্ব বেড়ে যায়।
গত দুই সপ্তাহে আগামী নির্বাচনের আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারছিল না ইসলামী আন্দোলন। তাদের দাবি ছিল দেড়শর বেশি আসন। সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী আসন না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের’ বৈঠকে যায়নি দলটি।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলনে এসে ৮টি দলের আসন ভাগাভাগির হিসাব তুলে ধরেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। ওই ঘোষণায় ইসলামী আন্দোলন, জাগপা ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের জন্য আসন চূড়ান্ত করা হয়নি।
জামায়াতে ইসলামী ‘আশা’ করছিল, ইসলামী আন্দোলন শেষমেশ তাদের জোটেই যোগ দেবে এবং সেই ‘আশা’ থেকে ৪৭টি আসনের বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তবে চরমোনাই পীরের দল শেষ মুহূর্তে এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিল।


