চরকিশোরগঞ্জ-গজারিয়া নৌরুট: ডাকাতির পর নিরাপত্তা না বাড়িয়ে ৭টার পর চলাচল বন্ধ
মুন্সিগঞ্জ, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
মুন্সিগঞ্জ-এর গজারিয়া ও নারায়ণগঞ্জের চর-কিশোরগঞ্জ নৌরুটে গত ৫ জানুয়ারি ট্রলারে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে এই পথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার বা ডাকাত চক্রকে গ্রেপ্তারের পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭টার পর ট্রলার চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে গজারিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ি।
এই পথের নিয়মিত ট্রলার চালকরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
এদিকে, নৌ পুলিশের এমন আচরণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এই পথে নিয়মিত যাতায়াতকারী হাজারও চাকুরিজীবী ও সাধারণ মানুষ।
চর কিশোরগঞ্জ-গজারিয়া নৌ রুটে গত ৫-৬ বছর যাবৎ ট্রলার চালান গজারিয়ার বাসিন্দা জাকির হোসেন বাবু। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইরকম ডাকাতির ঘটনা আমার সময়ে আর শুনি নাই। নৌ পুলিশ নদীতে টহল না দিয়ে তীরে থেকে আমাদের ফোন দিয়ে বলে ট্রলার না চালাতে। অথচ তাদের দায়িত্ব টহল দেয়া।
ট্রলার চালক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ডাকাতির ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এক পাশে নৌ পুলিশ আরেক পাশে কোস্টগার্ডের স্টেশন থাকলেও এরকম একটি ঘটনায় কেউ এগিয়ে আসেনি।
ডাকাতির ঘটনা ও সন্ধ্যা ৭টার পর ট্রলার চলাচল বন্ধের নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে গজারিয়া নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ সরজিৎ কুমার ঘোষ বলেন, ডাকাতির ঘটনা আমার আওতাধীন এলাকায় পড়ে নি। এটি কলাগাছিয়া নৌ ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় পড়েছে। পরবর্তীতে তাহলে ট্রলার চলাচল বন্ধের নির্দেশনা কেন দিলেন জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
কলাগাছিয়া নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ সালেহ আহমেদ পাঠান এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কবে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে? আমি এরকম কিছু জানি না। এলাকাটি গজারিয়া নৌ ফাঁড়ির আওতাধীন। তারাই জানতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গজারিয়া কোস্টগার্ড কমান্ডারের নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে স্টেশনে দায়িত্বে থাকা আরেক ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করলে (০১৭৬৯৪৪১২৩৫) তিনি তার নাম-পদবী প্রকাশ না করে বলেন, এখন এখানে কেউ দায়িত্বে নেই। তারা নির্বাচনী দায়িত্বে আছে। ডাকাতির বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।
উল্লেখ্য, গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে গজারিয়া-চর-কিশোরগঞ্জ ফেরীঘাট এলাকায় দুটি যাত্রীবাহী ট্রলারে হানা দেয় ডাকাতদল। গজারিয়া ঘাটে কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও ডাকাতরা নির্বিঘ্নে ডাকাতি শেষ করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পার হতে চললেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
ডাকাতির ঘটনার পর যাত্রীরা আশা করেছিলেন নৌ-পথে টহল ও নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। কিন্তু তার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭টার পর ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ করে দিয়েছে তারা। এতে বিপাকে পড়েছেন চাকুরিজীবীরা। অফিস শেষ করে ঘরে ফেরার পথে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।
গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ট্রলারে পার হওয়ার সময় কয়েকজন যাত্রীর চোখে-মুখে দেখা গেছে আতঙ্কের ছাপ। অদূরে স্পিডবোটের সন্দেহজনক চলাচল দেখে যাত্রীদের মধ্যে নতুন করে ডাকাতির ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী যাত্রী ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রহমান আলী বলেন, “আমরা তো আর শখের বশে বা ঘুরতে বের হই না। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন অফিস শেষ করে ফিরতে আমাদের সন্ধ্যা হয়। ৭টার পর ট্রলার বন্ধ করে দিলে আমরা বাড়ি ফিরব কীভাবে? প্রশাসন ডাকাত না ধরে আমাদের চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে, এটা কোনো সমাধান হতে পারে না।”
আরেক যাত্রী সোহেল রানা আক্ষেপ করে বলেন, “কিছুক্ষণ আগেও দূরে স্পিডবোটের সন্দেহজনক মুভমেন্ট দেখলাম। কলিজা হাতে নিয়ে নদী পার হচ্ছি। ঘাটে কোস্টগার্ড-পুলিশ থাকতেও আমরা কেন নিরাপত্তাহীনতায় থাকব? নাগরিক হিসেবে কি আমাদের এইটুকু নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার নেই? আর তারা সন্দেহভাজন স্পিডবোট চলাচলে নজরদারি করে না কেন? ঘটনার দিন নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের টহল দলে নদীতে কেন ছিলোনা?”
এই পথে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের দাবি-সন্ধ্যার পর ট্রলার চলাচল বন্ধ না করে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানো হোক। ডাকাতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সাধারণ মানুষের নির্ভয়ে চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগীরা।


