ক্ষমতায় থাকলেও ‘নেতৃত্বশূন্য’ ও ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ মুন্সিগঞ্জ বিএনপি; আবদুল হাইয়ের মৃত্যুতে কঠিন সময়
মুন্সিগঞ্জ, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, মিল্লাদ হোসেন (আমার বিক্রমপুর)
বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও মুন্সিগঞ্জে দলটির সাংগঠনিক সংকট কাটেনি। প্রায় পাঁচ মাস ধরে জেলা কমিটির আহ্বায়কের পদ শূন্য। এর আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে সদস্যসচিবকে। ফলে জেলা পর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্বের অভাব দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সাংগঠনিক কার্যক্রম, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের ওপরও। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কোন্দল, সংঘর্ষ এবং নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এমন এক সময়ে মারা গেলেন পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক উপমন্ত্রী ও মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের সভাপতি আবদুল হাই। যিনি দলের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য মুখ হিসাবে ছিলেন দীর্ঘদিন।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জেলা বিএনপির নেতৃত্বসংকট নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই, একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়ানো, দলীয় বিরোধ মেটানো এবং নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে কেন্দ্রীয় বিএনপি নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু মুন্সিগঞ্জে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।
দলীয় কর্মসূচি ঘিরেও এই সমন্বয়হীনতার চিত্র দেখা গেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রীনগরে দলের দুই পক্ষ পৃথক কর্মসূচি আয়োজন করে। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। কেন্দ্র থেকে সারা দেশে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও স্থানীয় পর্যায়ে দুই পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
১৫ অক্টোবর ভোররাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আবদুল হাই। দীর্ঘদিন জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এই নেতা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পিকারও ছিলেন। তবে জীবনের শেষ কয়েক বছর অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন তিনি।
আবদুল হাইয়ের মৃত্যু জেলা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বসংকটের কারণ নয়। তবে মুন্সিগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেওয়া এই প্রবীণ নেতার বিদায় এমন এক সময়ে হলো, যখন দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং বিভিন্ন পক্ষের বিরোধ মিটিয়ে নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
আহ্বায়ক নেই, সদস্যসচিবও বহিষ্কৃত
২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মিজানুর রহমান সিনহাকে আহ্বায়ক এবং আবদুল হাইয়ের ছোট ভাই মহিউদ্দিন আহমেদকে সদস্যসচিব করে মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাত সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই বছরের জুনে কমিটির সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ৫৯ করা হয়।
এই কমিটির দায়িত্ব ছিল জেলার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু কমিটি গঠনের এক বছরের মধ্যেই এর নেতৃত্বে সংকট দেখা দেয়।
চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ২১ জানুয়ারি মহিউদ্দিন আহমেদকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এরপর ১৬ মে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা।
ফলে জেলা কমিটির শীর্ষ দুই পদেই নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আহ্বায়ক কমিটির আরও কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকটি কমিটির নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও অভিযোগ করেছেন।
এ অবস্থায় জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় কে করছেন, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া, দলীয় কর্মসূচির দায়িত্ব বণ্টন এবং স্থানীয় বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে জেলা নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ আহ্বায়ক কমিটির অবশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে এসব দায়িত্ব কীভাবে বণ্টন করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
৫৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হলেও সেটি এখনো কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ জেলা নির্বাহী কমিটিতে রূপ নেয়নি। নেতৃত্বের এই সংকট কাটাতে স্থানীয় নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। ফলে জেলা কমিটির নিয়মিত সভা, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তৃণমূলের কার্যক্রম তদারকি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
কেন্দ্রের নির্দেশনা বাস্তবায়নেও সমন্বয়ের ঘাটতি
জেলা বিএনপির নেতৃত্বসংকটের প্রভাব বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
কেন্দ্র থেকে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে তা সফলভাবে বাস্তবায়নে জেলা নেতৃত্বের ভূমিকা থাকে। উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করার প্রয়োজন হয়।
পাশাপাশি কোন এলাকায় কর্মসূচি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং কী ধরনের সাংগঠনিক উদ্যোগ প্রয়োজন, সেসব তথ্যও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানানোর কথা।
কিন্তু মুন্সিগঞ্জে জেলা কমিটির শীর্ষ দুই পদ শূন্য থাকায় এসব দায়িত্ব কে পালন করছেন এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি কীভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।
গত ২৬ আগস্ট বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এর অংশ হিসেবে ১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সেদিন শ্রীনগরে বিএনপির দুই গ্রুপের অনুসারীরা পৃথক কর্মসূচি আয়োজন করেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
এ ঘটনায় শ্রীনগর থানার পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্তত ৫ জন আহত হন।
ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কোন্দলের একটি উদাহরণ। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতা-কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
জেলা কমিটি কার্যকর থাকলে উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আগেই আলোচনা করে কর্মসূচির দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এবং বিরোধ মেটানোর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে শুধু জেলা নেতৃত্বের শূন্যতার কারণেই শ্রীনগরের সংঘর্ষ ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নিয়মিত সাংগঠনিক তদারকি প্রয়োজন। জেলার কোন উপজেলা বা ইউনিয়ন কমিটি কতটা সক্রিয়, কোথায় নতুন কমিটি প্রয়োজন, কোন এলাকায় দলীয় বিরোধ রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ কেমন হচ্ছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখা জেলা নেতৃত্বের অন্যতম কাজ।
জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেই বিএনপির সংসদ সদস্য থাকলেও তাঁদের দায়িত্বের সঙ্গে জেলা কমিটির সাংগঠনিক দায়িত্ব এক নয়। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু জেলা কমিটি গঠন, কাউন্সিল আয়োজন, তৃণমূলের নেতৃত্ব পুনর্গঠন কিংবা দলীয় বিরোধ মেটানোর জন্য পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন।
এই কাঠামো কার্যকর না থাকলে স্থানীয় নেতারা নিজ নিজ উদ্যোগে কর্মসূচি পরিচালনা করলেও পুরো জেলায় দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ীও পিছিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম
বিএনপির গঠনতন্ত্রে জেলা পর্যায়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে দুই বছর মেয়াদি নির্বাহী কমিটি নির্বাচনের বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে নতুন কমিটি গঠন সম্ভব না হলে আহ্বায়ক কমিটি গঠন এবং পরে কাউন্সিল আয়োজনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত নির্বাহী কমিটির অন্তত তিন মাসে একবার সভা করার কথা। সভার সিদ্ধান্ত ও উপস্থিত সদস্যদের স্বাক্ষরসংবলিত কার্যবিবরণী ঊর্ধ্বতন কমিটিতে পাঠানোর বিধানও রয়েছে।
অর্থাৎ, একটি দল পরিচালনার জন্য কেবল কমিটি ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত সভা, দায়িত্ব বণ্টন, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে কাজের হিসাব দেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
কিন্তু মুন্সিগঞ্জে ২০২৫ সালে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর এখনো নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি হয়নি। এর মধ্যেই কমিটির শীর্ষ দুই পদ শূন্য হয়ে পড়েছে।
আহ্বায়কের মৃত্যুর পর জেলা কমিটির সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সভা কবে হয়েছে, সেখানে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিংবা জেলার সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কোনো প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে কি না, তার তথ্যও পাওয়া যায়নি।
এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে মৃত্যু, বহিষ্কারসহ নানা কারণে শূন্য হওয়া পদ পূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, প্রয়োজনে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিচের পদের নেতাদের পদোন্নতি দিয়েও এসব পদ পূরণ করা হবে।
তবে সেই সিদ্ধান্তের পরও মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় শুধু নতুন নেতৃত্ব গঠন নয়, কমিটির নিয়মিত কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এবং তৃণমূলের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগ শক্তিশালী করার প্রয়োজনও রয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো বড় পরীক্ষা
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন মুন্সিগঞ্জ বিএনপির জন্য নতুন সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, স্থানীয় নির্বাচনেও তার পুনরাবৃত্তি এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
গত ১১ অক্টোবর বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে, তৃণমূল থেকে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই করতে এবং দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে নির্দেশ দেন।
সভা শেষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি প্রতিটি এলাকায় সমঝোতার ভিত্তিতে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করবে।
কিন্তু মুন্সিগঞ্জে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তৃণমূলের মতামত কারা সংগ্রহ করবেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কে সভা ডাকবেন কিংবা একই পদে একাধিক নেতা প্রার্থী হতে চাইলে তাঁদের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ কে নেবেন—এসব বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে একজনকে সমর্থন দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাংগঠনিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ জন্য স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা এবং সব পক্ষের মতামত নেওয়া জরুরি।
কিন্তু জেলা পর্যায়ে নেতৃত্বের শূন্যতা থাকায় এই প্রক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর সুযোগে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সামনে আনতে পারে। এতে নির্বাচনী প্রচারে বিভক্তি কিংবা একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যেসব এলাকায় দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে বিভক্তি কাটেনি
মুন্সিগঞ্জ সদর ও গজারিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন এবং বহিষ্কৃত নেতা মহিউদ্দিন আহমেদকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে দুটি পক্ষ রয়েছে।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি কামরুজ্জামান রতনকে মনোনয়ন দেওয়ার পর মহিউদ্দিনের সমর্থকেরা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করেন। একপর্যায়ে মুক্তারপুর সেতু অবরোধের ঘটনাও ঘটে।
দলীয় মনোনয়ন পরিবর্তন না হওয়ায় মহিউদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। এ কারণে তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কামরুজ্জামান রতন জয়ী হন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন আহমেদ পরাজিত হন।
নির্বাচনের পরও দুই পক্ষের বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি। বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাই করতে হলে আগে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। কিন্তু জেলা পর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্বের অভাব সেই কাজকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
চাঁদাবাজির অভিযোগেও বিতর্ক
দলীয় কোন্দলের পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও মুন্সিগঞ্জ বিএনপির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার কাটাখালী এলাকার বাসা থেকে কাজি মো. হাবিবুর রহমানকে বিয়ে পড়ানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে মুক্তারপুরের একটি কক্ষে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে তাঁকে হুমকি দিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।
এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর সদর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজিব হোসেন অপু ও তাঁর সহযোগী স্বপনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির দুই লাখ টাকা উদ্ধার করার কথাও জানানো হয়।
ঘটনার পর ৬ অক্টোবর রাজিব হোসেন অপুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে যুবদল।
অভিযোগ ওঠার পর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং অভিযোগ যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা কার কাছে জানানো হবে, কে অভিযোগ যাচাই করবেন এবং কখন বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আনা হবে—এসব ক্ষেত্রে জেলা নেতৃত্বের সমন্বয় প্রয়োজন।
কার্যকর সাংগঠনিক তদারকি থাকলে স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে জেলা বিএনপির নেতৃত্বসংকটের কারণেই ওই চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই।
গত ১১ অক্টোবর সংসদীয় দলের সভার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আবারও জানায়, চাঁদাবাজি, দখলদারত্বসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ যাচাই, নিয়মিত তদারকি এবং সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আবদুল হাইয়ের বিদায়, নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন
মুন্সিগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে আবদুল হাই ছিলেন দীর্ঘদিনের পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতা। ১৯৭৩ সালে পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু। পরে পাঁচবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
তবে তাঁর নেতৃত্বকালেও জেলা বিএনপি বিরোধমুক্ত ছিল না। কমিটিতে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব, নেতৃত্ব নির্বাচন ও সাংগঠনিক প্রভাব নিয়ে একাধিকবার মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল।
জীবনের শেষ কয়েক বছর অসুস্থতার কারণে আবদুল হাই সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। ওই সময়ে তাঁর ছোট ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধের জেরে তিনিও বহিষ্কৃত হন।
এর মধ্যে কয়েক মাসের ব্যবধানে মারা গেলেন জেলা বিএনপির দুই প্রবীণ নেতা মিজানুর রহমান সিনহা ও আবদুল হাই।
বিএনপি সরকার গঠনের প্রায় আট মাস পরও মুন্সিগঞ্জ জেলা সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতা কাটেনি। অথচ ক্ষমতায় থাকার সময় রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্ব শুধু নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড তদারকি, জনগণের অভিযোগ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একটি জেলা সংগঠন সচল রাখতে নিয়মিত সভা, দায়িত্ব বণ্টন, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি তৃণমূলের সমস্যা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানানো এবং কেন্দ্রের নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের অগ্রগতিও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হয়।
মুন্সিগঞ্জে এসব কাজের সমন্বয় নিয়ে অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো দলীয় বিভক্তি এবং বিভিন্ন এলাকায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধ।
ফলে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে শুধু নতুন জেলা কমিটি গঠন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন নেতৃত্বকে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করতে হবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বও নিতে হবে।
আবদুল হাইয়ের মতো দীর্ঘদিনের একজন সাংগঠনিক নেতা বিদায় নিলেন। তার আগেই মারা গেছেন জেলা কমিটির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহা। কিন্তু এই দুই প্রবীণ নেতার অনুপস্থিতিতে মুন্সিগঞ্জ বিএনপিতে নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
নতুন নেতৃত্ব কবে আসবে, পুরোনো বিরোধ কীভাবে মিটবে এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জেলা সংগঠন কতটা কার্যকর হবে—মুন্সিগঞ্জ বিএনপির সামনে এখন সেই প্রশ্নগুলোই বড় হয়ে উঠেছে।









