এক্সপ্লেইনার: বিক্রমপুর নামে কেন ডাকা হয় মুন্সিগঞ্জকে?
মুন্সিগঞ্জ, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু জনপদ রয়েছে, যেগুলোর নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাজকীয় ঐতিহ্য, জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও প্রাচীন সভ্যতার চিত্র। তেমনই এক ঐতিহাসিক জনপদের নাম “বিক্রমপুর”।
বর্তমানের মুন্সিগঞ্জ জেলাকে আজও অনেকে “বিক্রমপুর” নামেই ডাকেন। কিন্তু কেন এই নাম? কী সেই ইতিহাস, যার কারণে শত শত বছর পেরিয়েও মুন্সিগঞ্জের পরিচয়ের সঙ্গে অটুটভাবে জড়িয়ে আছে “বিক্রমপুর” শব্দটি?
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, “বিক্রমপুর” ছিল প্রাচীন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জনপদ। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ছিল না, বরং ছিল রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্মীয় চর্চা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
ধারণা করা হয়, “বিক্রমপুর” নামটির উৎপত্তি কোনো প্রাচীন শাসক বা রাজবংশের নাম থেকে। কেউ কেউ মনে করেন, “বিক্রম” শব্দটি এসেছে শক্তি, বীরত্ব ও প্রভাবের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত শব্দ থেকে, আর “পুর” অর্থ নগর বা জনপদ। অর্থাৎ “বিক্রমপুর” বলতে বোঝায় বীরত্বের নগর বা সমৃদ্ধ জনপদ।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে অতীশ দীপঙ্কর-এর জন্মস্থান হিসেবেও বিক্রমপুর বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ দার্শনিক ও জ্ঞানতাপস, যিনি তিব্বত পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তার জন্ম বিক্রমপুর অঞ্চলে হওয়ায় এই জনপদের মর্যাদা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ে।
মধ্যযুগে বিক্রমপুর ছিল বাংলার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র। বিশেষ করে রাজা বল্লাল সেন ও সেন রাজাদের আমলে বিক্রমপুর ছিল বাংলার রাজধানীগুলোর একটি। সেন রাজবংশের শাসনামলে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য মন্দির, শিক্ষাকেন্দ্র ও বসতি। নদীবেষ্টিত উর্বর এ অঞ্চল তখন ছিল অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন বিক্রমপুরের বিস্তৃতি বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বাইরেও ছড়িয়ে ছিল। এর আওতায় বর্তমান ঢাকার কিছু অংশ, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামো বদলালেও মানুষের মুখে মুখে “বিক্রমপুর” নামটি থেকে যায়।
মোগল আমলে এই অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে “মুন্সিগঞ্জ” নামটির প্রচলন শুরু হয়।
ধারণা করা হয়, মোগল প্রশাসনের একজন “মুন্সি” বা রাজকর্মচারীর নামানুসারে “মুন্সিগঞ্জ” নামের উৎপত্তি। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলেও সরকারি নথিপত্রে “মুন্সিগঞ্জ” নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে স্থানীয় মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের জায়গায় “বিক্রমপুর” নাম কখনও হারিয়ে যায়নি।
আজও মুন্সিগঞ্জের অনেক মানুষ নিজেদের “বিক্রমপুরের মানুষ” পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বিক্রমপুরের মানুষের সংগঠন, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্যের মধ্যেও এই নামের ব্যবহার দেখা যায়। এমনকি সাহিত্য, গান, লোককথা ও ইতিহাসের বইয়েও “বিক্রমপুর” নামটি গভীর আবেগের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতিতেও বিক্রমপুরের অবদান অসামান্য। এ অঞ্চল থেকে জন্ম নিয়েছেন বহু সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। একসময় বিক্রমপুরকে “বাংলার অক্সফোর্ড” বলেও অভিহিত করা হতো, কারণ এখানকার শিক্ষার হার ও জ্ঞানচর্চা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই প্রশ্ন করেন— “মুন্সিগঞ্জ আর বিক্রমপুর কি আলাদা?” বাস্তবে প্রশাসনিকভাবে জেলার নাম মুন্সিগঞ্জ হলেও ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে এ অঞ্চল এখনো বিক্রমপুর নামেই সমধিক পরিচিত। অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জ হলো আধুনিক প্রশাসনিক নাম, আর বিক্রমপুর হলো হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পরিচয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, একটি অঞ্চলের নাম শুধু পরিচয় নয়, সেটি বহন করে শত বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ। সেই দিক থেকে “বিক্রমপুর” কেবল একটি নাম নয়, এটি বাংলার গৌরবোজ্জ্বল অতীতের প্রতীক।
আজকের আধুনিক মুন্সিগঞ্জ যতই নগরায়নের পথে এগিয়ে যাক না কেন, “বিক্রমপুর” নামটি মানুষের হৃদয়ে ইতিহাসের এক চিরন্তন আলো হয়ে বেঁচে থাকবে।





