গজারিয়া গণহত্যা দিবস: কলঙ্কময় ও রক্তভেজা দিন আজ
1

মুন্সিগঞ্জ, ৯ মে ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

আজ ৯ মে, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় ও রক্তভেজা দিন। ৫৫ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা মিলে গজারিয়ায় চালিয়েছিল এক পরিকল্পিত ও বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ।

১৯৭১ সালের এই দিন ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে যখন মসজিদের মিনারে ফজরের আজান ধ্বনিত হচ্ছিল ঠিক তখনই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের প্রায় ১০০ জনের একটি দল অতর্কিত হামলা চালায় গজারিয়ার ১০টি গ্রামে।

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৩৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জনপদে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নির্বিচারে হত্যা করা হয় প্রায় ৩৬০ জন নিরীহ মানুষকে। ​

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, আগের দিন ছিল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। মিলাদ ও ইবাদত শেষে ভোরের তন্দ্রাচ্ছন্ন গজারিয়াবাসী তখন গভীর ঘুমে।

রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক আলো জানান, এই গণহত্যার পেছনে ছিল স্থানীয় রাজাকারদের নীল নকশা। এর আগে গজারিয়া হাই স্কুলে ৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়েছিল। সেই খবর রাজাকার খোকা চৌধুরী, সাম চৌধুরী ও গফুর চৌধুরীদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় পাক বাহিনীর কাছে। রাজাকার ফালু বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘর চিনিয়ে দিলে শুরু হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ।

সেদিনের সেই বর্বরতায় গোসাইরচর, নয়নগর, বালুরচর, বাঁশগাঁও জেলেপাড়া, ফুলদী, নাগের চর, কলসেরকান্দি, দড়িকান্দি ও গজারিয়া গ্রামে কান্নার রোল পড়ে যায়। পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ও তার বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান নারী-শিশুসহ অসংখ্য মানুষ।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে নিহতদের দাফন করার মতো পুরুষ মানুষও গ্রামগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

প্রত্যক্ষদর্শী ওমর ফারুক আখন্দ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, মানুষের আর্তচিৎকার আর রক্তে চারপাশ এক বীভৎস রূপ নিয়েছিল। লাশের জাতপাত না খুঁজে তলাপাতা, পুরনো শাড়ি বা চাদর পেঁচিয়ে এক গর্তে অনেককে মাটিচাপা দিতে হয়েছিল সেদিন।

বহু লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফুলদী ও মেঘনা নদীতে যা পরে শকুন আর কাকের খাদ্যে পরিণত হয়।

এই গণহত্যার পৈশাচিকতা স্থান পেয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থেও।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ (অষ্টম খণ্ড) এবং মুনতাসীর মামুনের ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’-এ গজারিয়ার এই বিভীষিকাময় ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

সাংবাদিক ও গবেষক শাহাদাত পারভেজ জানান, ১২ মে ১৯৭১-এ ব্রিটিশ কূটনীতিক কে. ডব্লিউ. হ্যাজেলের পাঠানো এক গোপন টেলিগ্রাম বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে পাকিস্তানি বাহিনী গজারিয়ার গ্রামগুলো মাটিতে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেখানে নিহতের সংখ্যা ৫০০-এর বেশি হতে পারে। যুবকদের টার্গেট করে হত্যার নির্দেশের কথা বলা হয়েছিল সে টেলিগ্রাম বার্তায়।

​স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও গজারিয়ার সেই বধ্যভূমিগুলো আজও রয়ে গেছে অরক্ষিত। নিহত ৩৬০ জনের মধ্যে মাত্র ১৩০ জনের পরিচয় নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। শহীদ পরিবারগুলোর অবস্থা আরও করুণ।

নয়ানগর গ্রামের শহীদ পরিবারের সদস্য কমলা বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বাবা আর ভাইকে চোখের সামনে মরতে দেখেছি। মা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। আজ পর্যন্ত সরকারের কোনো সহায়তা আমাদের ভাগ্যে জোটেনি।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গজারিয়ার এই আত্মত্যাগের ইতিহাস যেন মুছে না যায় সেজন্য প্রতিটি গণকবর দ্রুত সংরক্ষণ করা এবং অবহেলিত শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ