‘এত টাকা খরচ করে ঘরবাড়ি- দোকানপাটের উপর দিয়ে ব্রিজ বানিয়ে লাভ কি?’
মুন্সিগঞ্জ, ১৭ জুন ২০২৫, জিতু রায় (আমার বিক্রমপুর)
সংযোগ সড়কের অভাবে মুন্সিগঞ্জে ২০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত ২টি সেতু অচল পড়ে আছে।
সদর উপজেলার চরাঞ্চলের পাঁচ ইউনিয়নের প্রবেশদ্বার মুন্সিরহাট ও হামিদপুরে খালের ওপর পুরানো দুইটি বেইলী সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০২৩ সালে নতুন আরসিসি সেতু নির্মানের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্পের মেয়াদ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসের আগেই সেতুর নির্মান কাজ শেষ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। তবে পুরানো সেতুর পাশে নতুন সেতুর নির্মান কাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় চালু হয়নি বাইদ্দাবাড়ি-১ ও বাইদ্দাবাড়ি-২ সেতু।
সংযোগ সড়কের জন্য সেতু নির্মাণের পূর্বে ভূমি অধিগ্রহণ না করায় এই জটিলতা। সেতুতে উঠতে নামতে সংযোগ সড়কের স্থানে বাড়িঘর ও দোকানপাট। এসব ভূমি মালিকরা ন্যায্য মূল্যের দাবিতে ছাড়তে চাইছেন না তাদের জমি। ফলে এখনো পুরানো জরাজীর্ণ বেইলী সেতু দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত করছে পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।
উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, জরাজীর্ণ ও অপ্রশস্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলী সেতু আরসিসি সেতু প্রতিস্থাপন প্রকল্প’ (ঢাকা জোন) এর আওতায় প্রকল্পটির কার্যাদেশ হয় ২০২৩ সালের পহেলা জানুয়ারী। ২৮.২৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮.২৫ মিটার প্রস্থের বাইদ্দাবাড়ি সেতু এক ও ৫০.১২ মিটার দৈর্ঘ্য ১০.২৫ মিটার প্রস্থ বাইদ্দা বাড়ির সেতু দুই এর নির্মান ব্যয় ধরা হয়েছিলো ১৯ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির ৯৫% কাজ শেষ করতে ব্যয় হয়েছে ১৮ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা।
সরকারি হরগঙ্গা কলেজের একাদশ শেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার জানান, ’এই প্রথম দেখলাম সেতুতে ওঠার দুই পাশে রাস্তা না বানিয়ে সেতু বানিয়ে ফেলতে। ভাঙ্গা সেতু দিয়ে যাওয়া-আসা করতে আমাদের অনেক ভয় করে।সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সরকারের এত অর্থ ব্যয় করে সেতু দুইটি চালু করা যাচ্ছে না। এর জন্য কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে।’
ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা চালক ইউসুফ বেপারি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এত টাকা খরচ করে ঘরবাড়ি- দোকানপাটের উপর দিয়ে ব্রিজ বানিয়ে লাভ কি? রাস্তা বানাইলো না। আমরা যেতে পারিনা। এখন পর্যন্ত আমরা ভাঙ্গা ব্রিজ দিয়ে চলতাছি।’
মুন্সিরহাট বাজারের স্যানেটারী ব্যবসায়ী হাসান বাবুল জানান, ‘আগের জরাজীর্ণ সেতু ভেঙে সেই স্থানে নতুন সেতু নির্মাণ করলে ভালো হতো। সরকারি খাস জমিতে সেতু নির্মাণ করলে এতদিনে সেতু দুইটি চালু হয়ে যেত। আর সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেচে যেত। যদি নকশা জটিলতার কারণে পুরানো সেতুর পাশে নতুন সেতু নির্মাণের্ এতোই প্রয়োজন পড়তো তাহলে এতদিনে কেন ভুমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হলো না? আমরা সরকারের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি যত দ্রুত সম্ভব এই পাঁচটা ইউনিয়নের গাড়ি যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সেতু দুইটি চালু করার ব্যবস্থা করা হোক।’
ভূমি মালিকদের অভিযোগ, তাদের ক্রয়কৃত সম্পত্তিগুলো অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া সেতু নির্মাণের পূর্বে শুরু না করে প্রতারণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, সরকারি প্রক্রিয়া মেনে তাদের উচ্ছেদ করা হোক।
স্থানীয় বাসিন্দা ভূমি মালিক ইমন আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা কি সরকারি জায়গায় থাকছি। আমরা জায়গা কিনে নিয়েছি। ব্রিজের পাশে সরকারি খাস জায়গা থাকা সত্ত্বেও ব্রিজ মালিকানা জায়গায় উপর দিয়ে কেন উঠালো এটা আমরা সাধারণ মানুষ এবং মালিকরা বুঝতেছিনা। কারণ সরকারি খাস জমির উপর দিয়ে যদি ব্রিজগুলো উঠাতো তাহলে সরকারের কোটি কোটি টাকা বেঁচে যেত। আর আমাদেরও বাপ-দাদার ভিটা মাটি ছাড়তে হতো না।’
আরেক ভূমি মালিক নাজমুল কবির সুরুজ বলেন, ‘সরকার যদি দ্রুত আমাদের মালিকদের টাকা পয়সা বুঝিয়ে দেয় তাহলে তো আমরা জায়গা ছেড়ে দেই। এখন মালিকরা টাকা না পেলে তো জায়গা ছাড়বে না।’
ভূমি মালিক কৃষক কাশেম আলী মোল্লা বলেন, ‘আমার দুই ভাই নিবন্ধন করে আসছে। আমি নিবন্ধন করি নাই। নিবন্ধন করি নাই কারণ আমি ন্যায্য মূল্য পাই নাই৷ আমার ৩টা ঘরের দাম ঠিক মেতা ধরে নাই।’ আমাগো নোটিশ দিচ্ছে মাত্র চার-পাঁচ দিন হয়। নোটিশে লেখা আছে মাত্র ৬ লক্ষ টাকা। আমাগো ঘরবাড়ি তুলতে খরচ হইছে চৌদ্দ লক্ষ টাকা। ৬ লক্ষ টাকা আমাদের ন্যায্য মূল্য হয় নাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুস হোসেন সানি বলেন, ‘আমাদের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের প্রায় ৪৮টি ব্রিজ নির্মাণ চলছে। তার মধ্যে দুইটি ব্রিজ হচ্ছে বাইদ্দা বাড়ি এক ও বাইদ্দা বাড়ি দুই সেতু। সেতু দুইটির মূল স্ট্রাকচার কমপ্লিট হয়েছে। শুধুমাত্র দুই সাইডের এপ্রোচ অংশের কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পটির ভূমি গ্রহণের জন্য আমরা ওয়েট করছি। যদিও অমরা ভুমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটি শুরু করেছি ২০২২ সালে। আট ধারায় নোটিশ জারি হয়ে গিয়েছে। সামনে দখল হস্তান্তর কাজ শেষে আমরা মূল কাজ শুরু করতে পারব। প্রকল্পের মেয়াদ জুন পর্যন্ত রয়েছে তবে সেতুর কাজ শেষ হলেও জমি বুঝে না পাওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বর্ধনের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুমোদনের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে।’







