মুন্সিগঞ্জে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচে ডকুমেন্টারি-নাটক ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘিরে বিতর্ক
মুন্সিগঞ্জ, ৫ আগস্ট ২০২৫, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
মুন্সিগঞ্জে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচে ডকুমেন্টারি-নাটক ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘিরে বিতর্ক
স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের আয়োজনে আইডিয়া প্রতিযোগিতার অংশ হিসাবে নির্মিত ডকুমেন্টারি ফিল্ম, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও মঞ্চ নাটক ঘিরে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, সরকারের প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ করা হলেও এই উদ্যোগগুলোতে মুন্সিগঞ্জ জেলার জুলাই আন্দোলনকে যথাযথভাবে দৃশ্যায়ন করা হয়নি।
গতকাল (সোমবার) সন্ধ্যা ৭টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গনে ‘জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ হয়। সরেজমিন সেখানে ঘুরে দেখা যায়- প্রায় প্রত্যেকেই হতাশা প্রকাশ করছেন আলোকচিত্র নিয়ে।
দুই লাখ টাকা বরাদ্দের এই প্রদর্শনীতে মুন্সিগঞ্জ জেলার দৃশ্যগুলো মূল প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি। মূল জায়গার বাইরে শিল্পকলা একাডেমির একটি দেয়ালে কাঠের ফ্রেমের উপর পৃথক দুইটি ব্যানারে স্থান পেয়েছে অল্প কয়েকটি মুন্সিগঞ্জের ছবি। যার মধ্যে আন্দোলনে হামলা-মারধর বা বিভীষিকাময় তেমন চিত্র ফুটে উঠেনি।
অন্যদিকে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দের ডকুমেন্টারি ফিল্ম `35th July’ প্রদর্শনী নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অনেক জুলাই যোদ্ধা প্রতিবাদ জানিয়েছেন এই প্রতিবেদকের কাছে।
একই চিত্র ছিলো জুলাই আন্দোলন নিয়ে মঞ্চনাটক নির্যাস মঞ্চস্থের সময়ও। নাটকে ফুটে উঠেনি মুন্সিগঞ্জে জুলাই আন্দোলনের কোন দৃশ্যপট। একপর্যায়ে মঞ্চের সারিতে বসা দর্শকের পক্ষ থেকে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতেও শোনা গেছে।
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ছবির ধরণ ও নির্বাচনে ক্ষোভ জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জের আন্দোলন সংশ্লিষ্ট অনেকে।
আহত জুলাই যোদ্ধা মো. মাইনুল ইসলাম মারুফ বলেন, মুন্সিগঞ্জে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের আলোকচিত্র প্রদর্শনী হবে শুনে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি এখানে বেশিরভাগ ছবি ঢাকার বিভিন্ন এলাকার। মুন্সিগঞ্জের ঘটনাগুলোকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। আমি হতাশ।
জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা ফারদিন হাসান আবির বলেন, ডকুমেন্টারিতে মুন্সিগঞ্জের পুরো আন্দোলনের বর্ণনা থাকার দরকার ছিলো। নাটকটিতে জুলাই বা মুন্সিগঞ্জে আন্দোলনের কিছুই ফুটে উঠেনি। আলোকচিত্র প্রদর্শনীর কিছু ছবির প্লেসমেন্ট আরো ভালো হতে পারতো। পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জের আন্দোলনের পটভূমি এবং কমন ছবিগুলো আরো ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা যেতো। এগুলো না থাকায় নাটক-ডকুমেন্টারি ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর কোথাও মুল উদ্দেশ্য পরিপূর্ণ হয়নি।
জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সক্রিয় সংগঠন ‘জুলাই মঞ্চে’র আহবায়ক রায়হান রাব্বি বলেন, এসেছিলাম সেদিনের ঘটনাগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে। কিন্তু কোথাও আন্দোলনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করা হয়নি। আমি এই আন্দোলনের একজন সহযোদ্ধা হিসাবে খুবই হতাশ হয়েছি। ডকুমেন্টারিতে মুন্সিগঞ্জের আন্দোলনের একাংশ দেখানো হয়েছে কেবল এবং যারা এই প্রদর্শনীর দায়িত্বে ছিলো তারা তাদের নিজেদের লোকজনদের প্রমোট করেছে কেবল, প্রকৃত আন্দোলনকারীদের না করে। এটা আমাদের সকল আন্দোলনকারীদের জন্য হতাশাজনক।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আলোকচিত্রী প্রদর্শনীর জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া ডালিম রহমান বলেন, ‘প্রদর্শনীর ছবিগুলো আমরা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি, যা সংগ্রহ করেছি তাই দিয়েছি। এটা জেলা পরিষদের কাজ তো- তাই উনারা যা যা দেখেছে যা যা দিয়েছে তাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। আর এটার বাজেট ছিলো ২ লাখ টাকা।’
জানতে চাইলে জুলাই ডকুমেন্টারি ফিল্ম `35th July’-এর জন্য দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আমাদের পুরো ভিডিও প্রায় ৩৫ মিনিটের ছিলো। কিন্তু গতকাল আমরা দেখিয়েছি মাত্র ১২ মিনিট। কর্তৃপক্ষ যদি বলতো এই ১২ মিনিট আমাদের সম্পূর্ণ ভিডিও না, এর আরো অংশ এখনো এডিট চলমান রয়েছে তাহলে মানুষ আমাদের ভুল বুঝতো না। এই ৩৫ মিনিটের পুরো ভিডিও আমরা আরেকদিন উপস্থাপন করবো এবং কবে করবো তা আগেই জানিয়ে দিবো। অনেকে দেড় লাখ টাকা বাজেটের আমাদের এই ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তারা হয়তো জানে না এখানে ১৫% ভ্যাট আছে, এলইডি স্ক্রিণ ভাড়া, ঢাকা থেকে আনা ক্যামেরা ভাড়াও আছে।’
বক্তব্য জানতে জুলাই আন্দোলন নিয়ে মঞ্চস্থ করা নাটক ‘নির্যাস’ এর নির্মাতা পরাগ হোসেনের সাথে জেলা পরিষদের নোটিশে উল্লেখিত মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। সূত্র জানায়, এই নাটকের বাজেট ছিলো প্রায় দুই লাখ টাকা।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. নাজমা নাহার বলেন, ‘ডকুমেন্টরি ভিডিওতে তো সব শহিদদেরই দেখলাম। এখানে জুলাই যুদ্ধে যে ৩ জন মারা গেছে তাদের পূর্বের ভিডিও দেয়া হয়েছে। আমরা ৪ টা ৪ ধরনের প্রজেক্ট করেছিলাম। সেটা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একদম অল পারফেক্ট বলতে তো কোন কিছু নেই। এটা তো প্রতিযোগিতার একটি অংশ। প্রতিযোগিতায় ওরা সিলেক্ট হয়েছে এবং করে দিয়েছে। এমনতো না যে আমরা করে ওদেরকে দিচ্ছি। সমালোচনার ব্যাপারে আমার তেমন কিছু জানা নাই।’


