মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ৭০-৮০ বৎসরে ঈদে সামান্য জাকাতও পায়নি মুন্সিগঞ্জের বেদেপল্লীর বাসিন্দারা
শিহাব আহমেদঃ মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার ভাসমান বেদেপল্লী। পৌর ভবনের ঠিক পশ্চিম দিকে এর অবস্থান। ৬০-৭০ বৎসর এই বেদেপল্লীর বয়স। এখানে আছে প্রায় ৫০টি পরিবার। নদী সংলগ্ন ও নৈাকায় আছে আরও ২০-২৫টি পরিবার। তাদের অর্থনীতির প্রধান উৎস নদীতে মাছ ধরে তা বাজারে বিক্রি করে সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ। বাসার প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা তেমন কোন কাজ না করলেও ঈদে বাড়তি চাহিদা মেটাতে টুকটাক গার্মেন্টসের কাজ করতেই হয়। এছাড়া হাতেগোনা যে কয়েকজন স্কুলে যায় তাদের আনুসঙ্গিক খরচও বহন করতে হয় তাদের নিজেদের। পড়ালেখার ফাকে সুযোগ পেলেই তারাও বসে যায় মাছ ধরার জাল অথবা আঠা নিয়ে কাপড়ে পুথি বসাতে।
এভাবে বছরের পর বছর চলে যায়। ভাগ্য বদলানো পরের কথা, ভাগ্য বদলাবে এমনটা আশাও করে না এই ভূমিহীন সম্প্রদায়ের লোকজন। তবুও মুসলিম হিসেবে প্রতিবছর ঈদ উদযাপনের তাগাদা তাদেরও আছে। ১কেজির বদলে এক পোয়া সেমাই কিনে তারাও খায়। ঈদের নামায ঐসব বিত্তবানদের সাথে মিশে তারাও পরে যারা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ফরযের অংশ যাকাত থেকে সামান্য অংশ দিয়েও তাদের সাহায্য করে না। এমনকি গত ৭০-৮০ বৎসরেও কেউ তা করেনি।
এই বেদে পল্লীতে জন্ম নেয়া সবুজ মিয়ার ছেলে শান্ত (৯) জানান, ঈদে তাদের বাড়তি কোন চাহিদা নেই। তার বাবা নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করে যে উপার্জন করে তা থেকে তাদের ২ভাই এক বোনের পরিবারের জন্য ঈদে যা করতে পারেন ততটুকুই যথেষ্ট।
ঈদে আত্মীয় স্বজনের কাছে যাওয়া হয় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শান্ত বলেন, ‘আমাদের আত্মীয় স্বজনের অবস্থা তো আমাদের মতই। তারা তো তাদের নিজেদের চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খায়। আমরা ঈদে তাদের কাছে গিয়ে বাড়তি বোঝা হতে চাইনা। ঈদের দিন আমরা এই বেদেপল্লীতেই প্রতিবেশী সমমনাদের সাথে সময় কাটাই। স্থানীয় আমাদের বন্ধু থাকলেও তারা ঈদের সময় আমাদের খোজ নেয় না। আর বাসায় তো ভূলেও আসে না। তাদের কাছে এটা পাপের সমান’
জন্মের পর থেকে এই বেদেপল্লীতে আছে ১৮বছরের বিপ্লব নামের এক কিশোর। গত এক মাস ধরে নারায়ণগঞ্জের একটি তারকাটার ফ্যাক্টরীতে কাজ করে পরিবারকে সাহায্য করে সে। এবার ঈদে বোনাস পাবে কি না জানেনা বিপ্লব। তবুও ঈদ বোনাসের আশায় বুক বেধে আছে বিপ্লব। ঈদ বোনাসের সামান্য কয়টা বাড়তি টাকা দিয়ে মা’কে একটি নতুন জামা ও বাবাকে একটি পাঞ্জাবী কিনে দিতে চায় বিপ্লব। বিপ্লবের বাবা খোকন নদীতে মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটায়। তাতে কি? মাছ বাজারে তো আর ঈদ বোনাসের সুযোগ নেই। আর্থিক সঙ্কট তাদের নিত্যসঙ্গী। এই সংকট কাটিয়েই হয়তো কোনরকমভাবে এবারের ঈদটা চলে যাবে তাদের।
নিজের বাড়ি শরীয়তপুরে। বেদেপল্লীর জন্ম থেকে এখানেই আছেন। ৩ছেলে ৩ মেয়ের জন্ম এখানে। আর্থিক দৈন্যদশার কারনে সন্তানদের তেমন লেখাপড়ার সুযোগ করে দিতে পারেননি। তবে এখানকারই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পাশ করে এক ছেলে বিয়ে করেছে বেদেপল্লীতেই। প্রতিবেশীরা সবাই মিলে তাকে এখানকার সভাপতি বানিয়েছেন। এখানে বসবাসকারী লোকজনের ছোটখাট সমস্যা তিনিই দেখভাল করেন। ৭০বৎসরের বয়োজৈষ্ঠ বেদেপল্লীর সভাপতি শামসুল হক গত ৭বৎসর যাবৎ বিভিন্ন শারীরিক রোগে আক্রান্ত। বড় মেয়ে পুতুল জামায় পুথি লাগিয়ে ডজন প্রতি ৫০-১৫০ টাকা পর্যন্ত পায়। তাছাড়া এখানকার ১৪জন বয়স্ক ব্যাক্তি উপজেলা থেকে নিয়মিত বয়স্কভাতা পান। সবমিলিয়ে এবারের ঈদটা কেটে যাবে শামসুল হকদের।
শামসুল হকের ছোট মেয়ে ইতি স্থানীয় শহীদ জিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। ইতির কাছে ঈদ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘ক্লাসের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের সাথে মিশলেও ঈদে কোন খোজ নেয় না। আর আমরা কখনো ওদের কাছে কোন সাহায্যও চাইনা। কেউ যদি নিজ থেকে সমস্যার কথা জানতে না চায় তাহলে কি তাকে বলা যায়?’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংসদ বা পৌরসভার মেয়র ঈদ বা রমযানে কোন সাহায্য পাঠায় কি না বা মিরকাদিম পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম শাহিন যে প্রতি ঈদে রঙিন ব্যাগে উনার ছবি ছাপিয়ে বাড়িতে বাড়িতে সাহায্য পাঠান সেখান থেকে আপনাদের জন্য পাঠায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ভাসমান বেদেপল্লীর সহ-সভাপতি মোস্তফা সওদাগর জানান, ‘মেয়র শহীদুল ইসলাম শাহিনই একমাত্র ব্যাক্তি যিনি আমাদের ভালোমন্দের খোজখবর নেন। কিছুদিন আগে এখান থেকে আমাদের উচ্ছেদ করার জন্য একটি পক্ষ কাজ করছিলো। পরে মেয়র শাহিন তাদের সাথে বসে আমাদের থাকার ব্যাবস্থা কওে দিয়ে গেছেন। এবং আমাদেও জন্য স্থায়ী বাসস্থানের ব্যাবস্থা করবেন বলে আশা দিয়ে গেছেন। এর আগে আর একজন ব্যাক্তি ছিলেন মহৎ ব্যাক্তিত্বের অধিকারী তিনি হচ্ছেন পূর্বের জেলা প্রশাসক আজিজুল হক। উনি থাকলে আমাদের জন্য ঈদে বিশেষ ব্যাবস্থায় সাহায্য পাঠাতেন। তবে মেয়র শাহিন ঈদে কোন সাহায্য-সহযোগীতা করেন না আমাদের।





