অটল নীতি, ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সাদামাটা চলাফেরা ও সহজ বাচনভঙ্গি জনপ্রিয় করে আব্দুল হাইকে
মুন্সিগঞ্জ, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
রাজনীতিতে ক্ষমতা, পদ-পদবি আর প্রভাব অনেকেরই থাকে। কিন্তু মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে হলে প্রয়োজন হয় আলাদা ব্যক্তিত্বের। অটল নীতি, ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সাদামাটা জীবনযাপন আর সহজ-সরল বাচনভঙ্গি দিয়ে মুন্সিগঞ্জের মানুষের হৃদয়ে তেমনই একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আলহাজ আব্দুল হাই। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিত্বের এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাঁকে দলমত-নির্বিশেষে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। সেই মানুষটি আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে মুন্সিগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন আব্দুল হাই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মুন্সিগঞ্জের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ আব্দুল হাইয়ের জানাজা চার স্থানে অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিকাল ৪টায় দ্বিতীয়, সন্ধ্যার পর মুন্সিগঞ্জ শহরের সুপারমার্কেট এলাকায় দলীয় কার্যালয়ে তৃতীয় জানাজা এবং রাতে সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের মিরেশ্বরাই আলিয়া মাদ্রাসার ঈদগাহ মাঠে চতুর্থ ও শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল হাই। তাঁর বাবা মনির উদ্দিন ছিলেন ব্যবসায়ী। স্ত্রী জামিলা খাতুন, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর পারিবারিক জীবন। তাঁর বড় ভাই মহিউদ্দিন আহমেদও জেলা বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
শিক্ষাজীবনে মুন্সিগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মুন্সিগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও বিএ পাস করেন তিনি। পরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করার সংগ্রামে অবদান রাখেন।
স্বাধীনতার পর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন আব্দুল হাই। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সংসদীয় রাজনীতির সূচনা। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন তিনি। ঢাকা-৮ ও মুন্সিগঞ্জ-৪ আসন থেকে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থানের জানান দেন এই নেতা।
সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও ছিলেন আব্দুল হাই। পঞ্চম জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অষ্টম জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন প্যানেল স্পিকার।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতিতেও তাঁর দীর্ঘ পথচলা ছিল। মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং জেলার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কারণে মুন্সিগঞ্জে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
আব্দুল হাইয়ের পরিচয় কেবল সাবেক মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সাদামাটা চলাফেরা, সহজভাবে কথা বলার ধরন এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার কারণে তিনি মানুষের কাছে আলাদা পরিচিতি পেয়েছিলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় কাটিয়েও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের যে বৈশিষ্ট্য তিনি ধরে রেখেছিলেন, সেটিই তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো।
মুন্সিগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পথচলায় তিনি যেমন দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে অভিভাবকতুল্য হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাঁর প্রয়াণে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন হারাল অভিজ্ঞ এক নেতাকে, আর বহু মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেল তাঁর সহজ জীবনযাপন ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের পরিচয়।







