১১ মাস পরও মুন্সিগঞ্জের অন্তরের শরীরে রয়ে গেছে জুলাইয়ের গুলি
449

মুন্সিগঞ্জ, ২৯ জুলাই ২০২৫, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

শরীরে বুলেটের ব্যাথা নিয়ে এপাশ-ওপাশ ‍ঘুরে হাঁসফাঁস অবস্থায় দিন কাটছে। ৫ সদস্যের পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় দশা। এর মধ্যেই মাথাভর্তি দুশ্চিন্তা আর সুস্থ হওয়ার আকুতি। দেশে কয়েক দফা চেষ্টা করেও বের করা যায়নি, ঘাতক বুলেট কেড়ে রেখেছে অন্তরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা। অন্তরের দুঃখ যেন নিরন্তর।

মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার বেতকা ইউনিয়নের খিলপাড়া গ্রামে ঘনবসতির মাঝে মাটির একটি ঘর। টিনের বেড়া আর জানালা দিয়ে রোদের আসা-যাওয়া নিয়মিত। সেখানেই এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় অন্তর ঢালী’র (২২)। জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সফলতায় আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ১১ মাস পরও শরীরে বুলেট বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। সরকারের কাছ থেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও কাঙ্খিত চিকিৎসাসেবা পাননি দাবি করে আক্ষেপ অন্তরের।

অন্তর বলেন, ‘গত বছরের ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ শহরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা আন্দোলনের খবর পেয়ে বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের আন্দোলনস্থলে আমার চাচাতো ভাইসহ আরও কয়েকজন রওনা দেই। কিন্তু সিপাহীপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শহরগামী স্টুডেন্টদের গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করে বাড়ির দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে এমন খবর আসে। পরে আমরা ৩-৪ কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে সেখানে পৌছাই। দুপুর দুইটার দিকে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সামনে পতিত আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ছোড়া মুহুর্মুহু গুলির মুখে পরি আমি। হঠাৎ একটা গুলি আমার ডান পায়ের উরুতে যৌনাঙ্গের পাশে এসে লাগে। আমি মুহুর্তের মধ্যে ব্যাথায় কাতরাতে থাকি। দূর থেকে আমার চাচাতো ভাই মো. সাব্বির ঢালী এই দৃশ্য দেখে আমার দিকে ছুটে আসেন। তার সাথে আরও কয়েকজন আমাকে ধরাধরি করে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কোনরকম প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আমাকে ঢাকা নিয়ে যেতে পরামর্শ দেন চিকিৎসক। পরে পরিবারের সদস্যরা রাস্তায় ঝামেলা এড়াতে মুন্সিগঞ্জ সদর থেকে সড়ক পথে না গিয়ে পথ ঘুরে শ্রীনগর হয়ে আমাকে নিয়ে যান মিটফোর্ড হাসপাতালে। সেখান থেকে আমাকে নিয়ে যেতে বলা হয় পঙ্গু হাসপাতালে। কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় তীব্র আন্দোলন এবং জায়গায় জায়গায় আওয়ামী লীগের অবস্থানের কারনে শেষমেষ আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পরদিন বুলেট বের না করেই তড়িঘড়ি করে চিকিৎসকরা বাড়ি পাঠিয়ে দেন আমাকে।

অন্তর আরও বলেন, ‘এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিএইমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) যোগাযোগ করি আমি। সেখানকার চিকিৎসকরা আমাকে বলেন- দেশে অপারেশনের মাধ্যমে বুলেট বের করা হলে আমার পুরো একটি অংশ প্যারালাইজডের ঝুঁকি রয়েছে আবার এটি ভেতরে থেকে গেলে ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে। তবে বিদেশে নিয়ে উন্নত ব্যবস্থাপনায় অপারেশন করা গেলে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারবো আমি। কিন্তু আমার সেই ব্যবস্থাটা করে দিবে কে? একমাত্র সরকারই পারবে, এবং তাদেরই এই ব্যবস্থাটা করে দেওয়া উচিৎ। পরবর্তী সরকার এলে আমাদের কি অবস্থা হবে তার তো কোন ঠিক নাই।’

তিনি বলেন, বাড়ি এসে বিদেশে চিকিৎসার খবরটি মা-বাবাকে জানালে হতাশায় ভেঙে পড়েন তারা। এখনো সারাদিন আমাকে নিয়ে নানারকম কথাবার্তা জপতে থাকেন, হতাশা প্রকাশ করেন।

অন্তর বলেন, ‘আমি কয়েক দফায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেছি, কেউই আমাকে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়নি।’

অন্তরের পিতা হানিফ ঢালী বলেন, ‘আমি ঠিকমতো চোখে দেখিনা, একদিন দিনমজুরের কাজ করলে ৩ দিন ঘরে বসে থাকি। আহত হওয়ার আগে অন্তর বিভিন্ন জায়গায় ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করতো। এখন পায়ের ব্যাথায় সেটাও করতে পারে না। সারাদিন ঘরে শুয়ে থাকে।’

অন্তরের মা পারভীন বেগম বলেন, ‘আমাদের নিজেদেরই ঠিকমতো চলাফেরা করতে কস্ট হচ্ছে, ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা করাবো কেমনে?, সরকার যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায় তাইলে একটু নিস্তার হয়।’

মুন্সিগঞ্জ জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলের সদস্য সচিব জাহিদ হাসান বলেন, ‘অন্তর ঢালী গত বছরের ৪ আগস্টে আমাদের মুন্সিগঞ্জের একজন জুলাই যোদ্ধা। আন্দোলনে গিয়ে ওর ডান পায়ের উরুতে যে গুলি লেগেছিলে সেটি এগারো মাস পরও বের করা হয়নি। দেশে অপারেশন করে বের করলে ওর জীবনের ঝুঁকি থেকে যায়, পঙ্গুত্ব বরণ করার সম্ভাবনা আছে বিধায় এখনো পর্যন্ত অপারেশন করা হয় নাই। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি- তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বাহিরে প্রেরণ করতে হবে। আমরা চাই অতিদ্রুত সংশ্লিষ্ট যারা আছে, তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে বাহিরে প্রেরণ করা হোক।’

জেলা সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ওবায়দুল্লাহ বলেন, ‘আমি মাত্র নতুন যোগ দিয়েছি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখবো কি করণীয় রয়েছে। অন্তরকে আমার কাছে পাঠালে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করবো।’

সিভিল সার্জনের এই আশ্বাসের পর অন্তর ঢালী তার সাথে সরাসরি গিয়ে দেখা করলেও তিনি বিদেশ পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যাপারে কোন সমাধান দিতে পারেননি।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ