২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
শনিবার | সকাল ৭:১৪
‘রোলা’ আমাদের লৌহজংয়ের মেয়ে, আমাদের বিক্রমপুরের গর্ব
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ ২৮ নভেম্বর, ২০১৯, বিশেষ প্রতিনিধি (আমার বিক্রমপুর)

বিশ্বের নামিদামি সব মডেলের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুকরণ করতে পারাটা আমাদের অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। কারও কারও ধারণা, অনুকরণ সফল হলে নিজেকেও তুলে ধরা যাবে তাদের মতো করে। তরুণ প্রজন্মের ফ্যাশন ধারণার বেশিরভাগই দখল করে রেখেছে হলিউড আর বলিউড সংস্কৃতি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ফ্যাশন ধারণাও আমাদের মাঝে মাঝে বেশ প্রভাবিত করে। ঠিক এমনই যখন পরিস্থিতি তখন যদি শোনেন কোনো বাংলাদেশিকে অনুকরণ করতে ভিনদেশিরা ব্যস্ত। তাও আবার জাপানিদের মতো রক্ষণশীল ফ্যাশন সচেতনরাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বাঙালি সেই মডেলের স্টাইল অনুকরণে। তখন কি আপনার চোখ চড়কগাছ হবে? আপনার চোখ চড়কগাছ হলেও বিষয়টি কিন্তু সত্য। ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশি রোলাকে অনুকরণে ব্যস্ত জাপানি তরুণীরা। তার নামটি জাপানিদের কাছে এখন অতি পরিচিত।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রোলার জন্ম হয়েছে জাপানে। ১৯৯০ সালের ৩০ মার্চ তিনি জাপানের টোকিওতে জন্মগ্রহণ করেন।

তবে শিশুকালটা কেটেছে তার দাদার বাড়ি বাংলাদেশের বিক্রমপুর অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জে। খোজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সন্তান রোলা।

নয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ায় জাপানের ফ্যাশন আইকন রোলা দেশটির ভিনদেশি তারকাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে। ২০০৮ সাল থেকে জাপানের জনপ্রিয় কিছু পত্রিকার প্রচ্ছদে তাকে দেখা যেতে থাকে। ২০০৯ সালে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন ভিভি মডেল হিসেবে। এরপর একের পর এক সফলতার সিঁড়ি টপকে ওপরে উঠতে থাকেন তিনি। 

বর্তমানে কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে পাল্টে দিচ্ছেন জাপানি পপসংস্কৃতি। ফ্যাশনে আনছেন পরিবর্তন। এই রোলাই এখন জাপানি নারীদের আদর্শ। রোলা টোকিও গার্লস কালেকশন, শিবুইয়া গার্লস কালেকশন, গার্লস অ্যাওয়ার্ডসহ বড় বড় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে থাকে। জাপানি মিডিয়া জগতে তিনি ইয়াং ট্যালেন্ট হিসেবে পরিচিত।

সে দেশের ফ্যাশন পাগল তরুণীরা তো রোলাতেই পাগল। রোলা কী পরছেন, ব্যবহৃত অনুষঙ্গ কেমন, কোথায় খাচ্ছেন, হেয়ার স্টাইল, সাজগোজ- এসব নিয়ে কৌতূহলের যেন শেষ নেই।

২০১০ সালে টেলিভিশনে একটি ভ্যারাইটি শোয়ে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার টেলিভিশন ক্যারিয়ার শুরু হয়। এক বছরে ২০০টির বেশি শোতে অংশগ্রহণ করে রোলা চতুর্থ রাইজিং টিভি স্টার ইন ২০১১ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

শুধু মডেলিং নয়, সংগীত পরিবেশনেও তার দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার গাওয়া একক অ্যালবাম ‘মেমোরি’ টাইটেলের গানটি ২০১২ সালে বিলবোর্ড জাপান টপ চার্টের টপ টোয়েন্টিতে ছিল অনেক দিন।

জাপানের বিলবোর্ডগুলোতেও রোলার কদর বেশি। খুব সচরাচর চোখে পড়ে যাবে তার বড় বড় ছবি। টিভি খুললেই দেখা মিলবে ২৪ বছর বয়সী এই মডেলের। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপনের দৃশ্যগুলো জুড়েও থাকছেন রোলা।

জাপানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা মাত্র ১০-১২ হাজার। জাপানি বিয়ে করেছেন এমন প্রবাসীর সংখ্যা চার-পাঁচশর বেশি নয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এসব জাপানির অনেকেই জাপানের মূলধারায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে। তাদের রোল মডেল রোলা। জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেল ও সেলিব্রেটি রোলা। জাপান মাতিয়ে তিনি এখন হলিউড জয়ের পথে। জাপানি একটি টিভি চ্যানেলে বলা হয়েছে, অল্পবয়স্ক জাপানি নারীরা এখন রোলার মতো হতে চায়। অনেকেই এখন তার মতো পোশাক পরে। একই রকম ব্যাগ ব্যবহার করে। বিষয়টি কেমন যেন কার্টুনের মতো। কার্টুন দেখে বাচ্চারা যেমন নকল করে ঠিক তেমনি রোলাকে নকল করে উঠতি বয়সী তরুণীরা।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এএফপির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রোলা বলেন, ‘যখনই মানুষজন আমাকে বলে আরেকটু নরম হয়ে কথা বলো, আমি কখনই তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হই না। আমি কাউকে ছোট করতে চাই না। আমি একজন কৌতূক অভিনেতাও নই। আমি ঠিক আমার মতো। নিজের মন যা বলে তাই করি। আমি মনটা খুলে দিতে চাই। আর চাই অন্যরাও তাই করুক।’

জাপানি একটি টিভি চ্যানেলে বলা হয়েছে, ‘অল্পবয়সী জাপানি নারীরা এখন রোলার মতো হতে চান। অনেকেই এখন তার মতো পোশাক ও ব্যাগ ব্যবহার করে থাকেন।  বোঝা যায়, তার ভক্তগোষ্ঠীর সংখ্যা জাপানে কম নয়।’ ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত জাপানি গায়িকা ও অভিনেত্রী বেকি হলেন আরেকজন সুপার মডেল। জাপানে তারও প্রচুর ভক্ত রয়েছে। অপরদিকে ফরাসি বংশোদ্ভূত সংবাদপাঠক ক্রিসটেল তাকিগাওয়া টোকিও অলিম্পিক ২০২০ আয়োজনে শহরের দূত হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। ভিনদেশি বংশোদ্ভূত এসব জাপানি তারকার উত্থান জাপানিদের আচরণেও পরিবর্তন আনছেন।

রোলার বাবা জরিপ-আল-আসার জন্ম বাংলাদেশের বিক্রমপুর জেলায়। রোলার মা রুশ বংশোদ্ভূত জাপানি। রোলার জন্ম জাপানে। তবে তার শিশুকাল কেটেছে বাংলাদেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই তারকা মডেলের দারুণ কদর। তিনি ২০১২ সালের ২৯ ফেব্র“য়ারি টুইটারে নিজের একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। মাত্র তিন দিনের মাথায় তার ভক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯০ হাজারের ওপরে। এর দুই সপ্তাহ পরেই সেই সংখ্যা গিয়ে ঠেকে সাড়ে ৪ লাখে। ২০১৬ সালের হিসাব মতে রোলা সেদেশের তৃতীয় অনুকরণী মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং নারীদের মাঝে তিনি হন দ্বিতীয়। রোলা শুধু মডেলিং-এ পারদর্শী নন, ২০১৬ সালে রিসাইডেন্ট এভিল নামের একটি ফিচার ফিল্মে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করে নেন।

মডেলিং আর অভিনয়ের পাশাপাশি ২০১৩ সালে রোলা নিজের ব্যবসায়িক চিন্তাকে কাজে লাগান। বাজারে তার নিজস্ব একটি পারফিউম ব্র্যান্ডও আছে। এই ব্র্যান্ডের দুটি পারফিউম এবং পাঁচটি বডি স্প্রে আছে। ২০১২ সালে দি রোলা বুক নামের একটি ফ্যাশন বই প্রকাশ করেন তিনি। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে পরপর তার আরও দুটি ফ্যাশন বিষয়ক বই প্রকাশ পায়। তার ভক্তদের জন্য আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, রূপে-গুণে অনন্য এই মডেল রান্নাতে পটু। তার বেলাতে বাংলা প্রবাদ, যিনি রাঁধেন তিনি চুলও বাঁধেন প্রবাদটি একদম মিলে যায়। কারণ ২০১৫ সালে তিনি রান্না করে ‘বেস্ট কুক’ এর পুরস্কার পান

error: দুঃখিত!