মুন্সিগঞ্জের গর্ব একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন
মুন্সিগঞ্জ, ২৫ আগস্ট ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
বিক্রমপুরের মাটি যেন কেবল ইতিহাস আর ঐতিহ্যের গল্পই বলে না, এই মাটি জন্ম দিয়েছে এমন অনেক মানুষকে, যাঁরা নিজেদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে পরিচিত হয়েছেন। সেই গর্বের মানুষদের একজন কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক বাংলা কথাসাহিত্যে নিজের আলাদা একটি পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক।
ইমদাদুল হক মিলনের জন্ম ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। তাঁর জন্মস্থান মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মেদিনীমণ্ডল গ্রামে। শৈশবের একটি সময় কেটেছে নানির কাছে, পরে তিনি ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় চলে যান। তবে জন্মভূমি বিক্রমপুর তাঁর সাহিত্যিক সত্তায় গভীর ছাপ রেখে যায়।
তাঁর পৈতৃক শিকড়ও মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে। লৌহজংয়ের পয়সা গ্রামের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক। ফলে তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে ‘বিক্রমপুর’ নামটি যেন জন্ম থেকেই জড়িয়ে আছে।
শিক্ষাজীবনে তিনি জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনা করেন, যে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কলম হাতে ইমদাদুল হক মিলনের পথচলা শুরু হয় তরুণ বয়সেই। তাঁর প্রথম গল্প ‘বন্ধু’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। এরপর সাহিত্যচর্চা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়। প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে।
১৯৭৭ সালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘ভালোবাসার গল্প’ তাঁকে পাঠকের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে। প্রেম, সম্পর্ক, মানুষের টানাপোড়েন, গ্রামীণ জীবন ও সমাজবাস্তবতা—বিভিন্ন বিষয়কে সহজ ভাষায় তুলে ধরার কারণে তাঁর লেখা দ্রুত সাধারণ পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তৃতিও ছিল উল্লেখ করার মতো। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুই শতাধিক।
‘নূরজাহান’ থেকে ‘কালোঘোড়া’
ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্যজগত বৈচিত্র্যময়। তাঁর লেখায় যেমন প্রেম ও আবেগের গল্প আছে, তেমনি আছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামীণ সমাজ ও মানুষের জীবনসংগ্রাম।
‘যাবজ্জীবন’, ‘ভূমিপুত্র’, ‘পরাধীনতা’, ‘কালাকাল’, ‘নদী উপাখ্যান’, ‘কালোঘোড়া’, ‘পরবাস’, ‘বাঁকাজল’—এমন বহু উপন্যাস তাঁর সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
তবে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত সাহিত্যকর্মগুলোর একটি ‘নূরজাহান’। উপন্যাসটি দুই বাংলার পাঠকের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া তৈরি করে। গ্রামীণ জীবন, মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা ও আবেগের জটিলতাকে তিনি এই রচনায় শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন।
শুধু কথাসাহিত্যিক নন
ইমদাদুল হক মিলনের পরিচয় কেবল ঔপন্যাসিক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নাট্যকার, সাংবাদিক, কলাম লেখক এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর লেখা নাটকও একসময় টেলিভিশনের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
সাংবাদিকতার সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক। তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অর্থাৎ সাহিত্য থেকে সাংবাদিকতা, উপন্যাস থেকে নাটক—বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁকে একটি বহুমাত্রিক পরিচয় দিয়েছে।
পুরস্কারে স্বীকৃত দীর্ঘ পথ
সাহিত্যে অবদানের জন্য ইমদাদুল হক মিলন পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতিগুলোর একটি হলো ১৯৯২ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। এরপর ২০১৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন একুশে পদক।
একুশে পদক বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে প্রবর্তিত এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা সাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়।
বিক্রমপুরের নদী, জনপদ, মানুষ ও জীবনযাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। সেই জনপদেরই সন্তান ইমদাদুল হক মিলন নিজের শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতা, মানুষের জীবন এবং চারপাশের বাস্তবতাকে সাহিত্যের ভাষায় ধারণ করেছেন।








