২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
মঙ্গলবার | সন্ধ্যা ৭:৩৮
জগদীশ চন্দ্র বসু’র সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক কি?
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯, (আমার বিক্রমপুর)

বিশ্বের প্রথম জীবপদার্থবিজ্ঞানী ও মুক্ত দর্শনের বিজ্ঞানী বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ও বাঙালি কবি ও দার্শনিক তদুপরি বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর মধ্যে কি সম্পর্ক ছিলো তা নিয়ে আমাদের তরুণ-কিশোরদের মধ্যে ব্যপক আগ্রহ দেখা যায়। বিশেষত, বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররা এ নিয়ে বেশ কৌতুহলী। তাদের কৌতুহল মেটাতে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুকবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর মধ্যে সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তথ্য-প্রমাণ আকারে তুলে এনেছেন ‘আমার বিক্রমপুর’ এর প্রধান প্রতিবেদক শিহাব আহমেদ

স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু একজন বাঙালিপদার্থবিদ, উদ্ভিদবিদ ও জীববিজ্ঞানী এবং প্রথম দিকের একজন কল্পবিজ্ঞান রচয়িতা। তার গবেষণার ফলে উদ্ভিদবিজ্ঞান শাখা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবহারিক ও গবেষণাধর্মী বিজ্ঞানের সূচনা হয় তার হাত ধরে। ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স তাকে রেডিও বিজ্ঞানের জনক বলে অভিহিত করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

‘জগদীশ চন্দ্র বসু’ শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতা। তথ্যসূত্রঃ বিজ্ঞানচিন্তা (জগদীশ চন্দ্র বসু সংখ্যা)

জগদীশ চন্দ্র বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে অপরের বন্ধু ছিলেন। জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতার পরিচয়সূত্র ধরে তাদের মধ্যে সম্পর্কের শুরু। রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা ‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র আমার বাল্যস্মৃতি’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের পিতার সাথে জগদীশ চন্দ্র বসু ও পরবর্তীতে রবীন্দ্রসাথের সাথে পরম বন্ধুত্বের বিভিন্ন দিক রবীন্দ্রনাথ নিজেই তুলে ধরেন। তার সেসব লেখায় জগদীশ চন্দ্র বসুর মত বন্ধু পেয়ে তিনি বেশ উচ্ছসিত ছিলেন বলেই প্রকাশ পায়।

রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা ‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে তার পরিবার ও তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক তুলে ধরে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র আমার বাল্যস্মৃতি’ শিরোনামে লেখা প্রবন্ধ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে তার সাথে জগদীশ চন্দ্র বসুর ব্যক্তিগত সম্পর্ক তুলে ধরে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র আমার বাল্যস্মৃতি’ শিরোনামে প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমার পিতা যখন শিলাইদহে বোটে থাকতে যেতেন আমাকে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আমার পিতা যেমন উদ্গ্রীব হয়ে জগদীশচন্দ্রের আগমনের প্রতীক্ষা করতেন, আমারও তেমনি ঔৎসুক্য কম ছিলো না। আমার সঙ্গে তিনি গল্প করতেন, নানারকম খেলা শেখাতেন, ছোট বলে আমাকে উপেক্ষা করতেন না। আমি তাঁর স্নেহপাত্র হতে পেরেছি তাতে আমার খুব অহংকার বোধ হত। আমি মনে মনে কল্পনা করতুম বড় হলে আমি জগদীশচন্দ্রের মত বিজ্ঞানী হব।’

‘বর্ষার পর নদীর জল নেমে গেলে বালির উপর কচ্ছপ উঠে ডিম পাড়তে। জগদীশচন্দ্র কচ্ছপের ডিম খেতে ভালোবাসতেন। আমাকে শিখিয়ে দিলেন কী করে ডিম খুঁজে বের করা যায়। কচছপের মাংস খেতে জগদীশচন্দ্র খুব পছন্দ করতেন।’

‘পদ্মাচরে বসবাস জগদীশচন্দ্রের ভালো লাগতো। দেশে বিদেশে কত সুন্দর জায়গা তিনি দেখে এসেছেন। তবু আমাদের বলতেন, পদ্মাচরের মতো এমন সুন্দর স্বাস্থ্যকর স্থান পৃথিবীর আর কোথাও নেই।’

‘আমার ছেলেবেলাকার শিলাইদহের স্মৃতির সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের মধুর স্মৃতি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে লেখা জগদীশচন্দ্র বসুর চিঠি

‘আমি যখন আমেরিকায় কলেজে পড়ছি, জানতে পারলুম জগদীশচন্দ্র আমেরিকা-পরিভ্রমণে আসছেন। কয়েকটি ইউনিভার্সিটি বক্তৃতা দেবার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ করেছে। এই খবর পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলুম। সকালবেলায় জগদীশচন্দ্র আমাকে বললেন; ‘আমার বক্তৃতার সঙ্গে যে experimental demonstrations থাকবে তাতে তোমাকে সাহায্য করতে হবে। চল, সায়ান্স লেকচার হলে যন্ত্রগুলি খাটিয়ে রাখি ও তোমাকে দেখিয়ে দিই কি করতে হবে।’ আনন্দে অধীর হয়ে উঠলুম , আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে লাগল আমার সহপাঠীরা কী ঈর্ষার চোখেই না আমাকে এরপর দেখবে’

১৫ই অগ্রহায়ণ ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নিজের আরও একটি লেখায় তুলে ধরেছেন জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে তার সম্পর্কের কথা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নিজের আরও একটি লেখায় তুলে ধরেছেন জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে তার সম্পর্কের কথা।

সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগদীশ চন্দ্র বসু সম্পর্কে লিখেছেন, ‘স্যার জগদীশের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য যখন আমার হয় তখন তিনি যুবক এবং আমিও ছিলাম তাঁহার প্রায় সমবয়সী।’

রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয়ের পর জগদীশচন্দ্র আপার সার্কুলার রোডের বাড়িতে বাস করেন বেশ কিছুদিন। এই বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে জগদীশচন্দ্রের। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও শিবনাথ শাস্ত্রী, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ডাক্তার নীলরতন সরকার, লোকেন পালিত প্রমুখ এই বাড়িতে নিয়মিত আসতেন। রবীন্দ্রনাথ একাধিক চিঠিতে এই সার্কুলার রোডের বাড়িতে জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসুর বন্ধুত্বপূর্ণ সাহচর্যের উল্লেখ করেছেন। ইংল্যান্ড-প্রবাসী জগদীশচন্দ্রকে এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

“কলকাতায় আমার সুখ নেই। পূর্বে এখানে যখন আসতুম তোমাদের ওখানেই সর্বপ্রথম ছুটে যেতুম। এবারে সেরকম আগ্রহের সঙ্গে কোনখানে যাবার নেই। আজ প্রভাতেই তোমার চিঠিখানি পেয়ে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হলো। তোমার সেই ছোট ঘরটি থেকে তোমার আলাপ গুঞ্জন যেমন আমি হৃদয়ে পূর্ণ করে নিয়ে আসতুম নিজেকে আজও সেই রকম পূর্ণ বোধ করচি।”

বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুর প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বৃক্ষবন্দনা’। কবিতার শুরুতে বৃক্ষ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তার অনেকখানি প্রযোজ্য বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ক্ষেত্রেও। ইওরোপে বিজ্ঞানচর্চা শুরু হবার কয়েক শতাব্দী পরেও আমাদের এই উপমহাদেশের বিজ্ঞান-ভূমি ছিল অন্ধকারে। জগদীশচন্দ্র বসুই ছিলেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি এই উপমহাদেশে আধুনিক বিজ্ঞান-গবেষণার জাগরণ ঘটিয়েছিলেন। তিনিই বিশ্ববিজ্ঞানের আসরে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে সুবিধাবঞ্চিত তৎকালীন পরাধীন ভারতের বাঙালিও নিজের অধ্যবসায় ও মেধার জোরে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু’র মধ্যে ছিল সর্বজন বিদিত প্রগাঢ় বন্ধুত্ব।

আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু তার বিজ্ঞানকর্ম দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান মনস্কতার পিছনে জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান রয়েছে। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ জগদীশ চন্দ্র বসুকে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আর্থিক সাহায্য প্রদান করেছিলেন। দুই জনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এটি ছিল অন্যতম দিক। 

শুধু বিজ্ঞান নয়, বাংলা ভাষায় প্রথম কল্পকাহিনির লেখকও ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর লেখা সায়েন্স ফিকশান ‘নিরুদ্দেশের কাহিনি’ প্রথম ‘কুন্তলীন পুরষ্কার’ লাভ করেছিল। শিশুকিশোরদের জন্য বেশ কিছু বিজ্ঞান-প্রবন্ধ লিখেছিলেন জগদীশচন্দ্র যার সাহিত্য-মূল্যও অনেক। জগদীশচন্দ্র বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতিও ছিলেন কয়েক বছর। বাংলায় বিজ্ঞান-সাহিত্যে জগদীশচন্দ্রের অবদান ঐতিহাসিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন জগদীশচন্দ্রের খুবই কাছের বন্ধু। জগদীশচন্দ্র বসুকে দেশের মানুষের কাছে সম্মানের আসনে তুলে ধরার জন্য সবচেয়ে বেশি চেষ্টা যিনি করেছিলেন তিনি রবীন্দ্রনাথ। বিদেশে জগদীশচন্দ্রের বৈজ্ঞানিক সম্মানকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন বিদেশীদের বিরুদ্ধে পরাধীন ভারতবর্ষের জয় হিসেবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাপ্তির পর তাকে ‘বন্ধু’ সম্বোধন করে জগদীশ চন্দ্র বসুর হাতে লেখা চিঠি।

জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর গবেষণায় যে ফলাফল পেয়েছিলেন এবং যেসব যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিলেন আজ তার শতাধিক বছর পর আমরা সেখান থেকে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র আবিষ্কার করতে পেরেছি। প্ল্যান্ট নিউরোবায়োলজি, ক্রোনোবায়োলজি, ভেজিটেবল ইলেকট্রিসিটি ইত্যাদি সবকিছুরই পথিকৃৎ ছিলেন জগদীশচন্দ্র। ‘Integrative Biophysics Biophotonics’ -এ বায়োফিজিক্সের অগ্রদূতদের মধ্যে সবচেয়ে প্রথমে স্থান দেয়া হয়েছে জগদীশচন্দ্র বসুকে।

Dictionary of Scientific Biography-তে Charles Susskind বিজ্ঞান-ইতিহাসের তথ্য-প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন যে জগদীশচন্দ্র বসুই ছিলেন পৃথিবীর প্রথম জীবপদার্থবিজ্ঞানী বা বায়োফিজিসিস্ট।

আমরা আজ যে বিজ্ঞান-গবেষণার পথে খুব আস্তে আস্তে হলেও হাঁটতে শুরু করেছি, সেই পথ অর্ধ-শত বছরের কঠিন পরিশ্রমে তৈরি করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু – আমাদের বিক্রমপুরের জগদীশ।

তথ্যসূত্রঃ ১. বিজ্ঞান চিন্তা (জগদীশ চন্দ্র বসু সংখ্যা) ২. মুক্তমনা বাংলা ব্লগ ৩. উইকিপিডিয়া

error: দুঃখিত!