১৭ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
বুধবার | বিকাল ৪:৪৫
Search
Close this search box.
Search
Close this search box.
একটি অপরাধ ও আমাদের বিবেক
খবরটি শেয়ার করুন:

আমাদের মার্কেটে প্রায় প্রতিদিনই একটা না একটা চোর ধরা পড়ে।
কাঙালি চোর, শিশু চোর, মহিলা চোর থেকে শুরু করে ভদ্র চোর, সব আইটেমের চোরেই সয়লাব থাকে পবিত্র(!) মাস।
চোর ধরা খাবে, আর উত্তমমধ্যম খাবে না, তা কখনো হয়না।
কেউ কম খায়, কেউ বেশি খায়।
তবে এইসব চোর মার খেয়ে যতই রক্তাক্ত হোক, যতই মুমূর্ষু হোক, মরে যাওয়ার রেকর্ড নেই বললেই চলে। আর মরে গেলেও এই দায় কারও না। সবাই মিলেই তো মেরেছে!
এরা মার খেয়ে চলে যায়, আবার চুরি করতে আসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এরা ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আসছে।

ছেলেবেলায় আমি একবার একটা ডাকাতকে এমনভাবে মারতে দেখেছিলাম, যে তার চোখ কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছিলো। লোহার রড দিয়ে মাথায় ক্রমাগত বাড়ি দেওয়ায় রক্ত গড়িয়ে পড়ছিলো। আরেকটা বাড়ি দেওয়ার পরে লোকটা নিস্তেজ হয়ে গেলো। সবাই বুঝে গেলাম, একটা জীবন শেষ হয়ে গেলো। অথচ, যে লোকটা পিটাচ্ছিলো, সে আর থামেনা। এমন উন্মাদের মতো কী অজানা ক্ষোভ থেকে একটা মানুষকে মেরে ফেলা যায়, তা নির্ণয় করার সাধ্য একজন মনোবজ্ঞানীরও আছে কি-না আমার জানা নেই। যাদের নিজের কিছু চুরি বা ডাকাতি হয়নি, তাদেরকেই এমন নৃশংসভাবে আঘাত করতে দেখা যায়।
মৃত্যুর আঘাতটার জন্য কী সেই লোকটা হত্যাকারি হিসেবে সাব্যস্ত হবে, নাকি আগের আঘাতগুলোকেও হিসেবে ধরা হবে, তার বিশ্লেষণে কেউ যায়না।

যাইহোক, সেই ডাকাতটাও শেষপর্যন্ত মরেনি। প্রাণশক্তির তারিফ করতেই হয়। সবার আবার তেমন সহ্যক্ষমতা নেই।
যে আসল চোর না, তেমন কেউ হয়তো কয়েকটা চপটাঘাত খেয়েই মরে যাওয়ার অহরহ রেকর্ড আছে।
এরা মার খেয়ে অভ্যস্ত না, তাই ঠিক কততম ঘুষি, বা কততম লাথিতে প্রাণবায়ু ফুরিয়ে যাবে তা বলা যায়না।
প্রাণশক্তি বেশি হলে, হয়তো টিকে যাবে। নইলে যায়গামতো একটা খেলেই ফিনিশড।

কথা তা না, আসল কথা হলো, এই যে আমজনতা চোর ছিনতাইকারী হলেই মেরে ফেলার যে প্রবণতা, তা কতটা ঠিক? মেরে ফেলার পর যদি জানা যায়, সে কোনো চোরই ছিলোনা, তখন যে আমজনতা একটা হলেও কিল-ঘুষি-লাথিতে অংশগ্রহণ করেছিলো, তারাই ফুঁসে ওঠে। আসলে কার বিরুদ্ধে! নিজের বিরুদ্ধেই নয় কি?
যেসব মানুষ নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে একজন মানুষকে মারতে দেখে, সেটাও কি অপরাধ নয়?

৬টা ছেলেকে কয়েকবছর আগে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিলো গাবতলিতে। শিশু রাজনকেও চোর সন্দেহেই মেরেছে। রাজন ইস্যুতে চাপা পড়ে গেছে আরও ৩টি ছেলেকে চোর-ডাকাত সন্দেহে মেরে ফেলার খবর।
ওরা কেউ চোর-ডাকাত নয় বলে মেরে ফেলাটা যতটা আমাদের হৃদয় কে স্পর্শ করে, আসল চোর ডাকাতের ক্ষেত্রে বিবেকে ততটা নাড়া দেয়না।
মেরে ফেলাটা সেক্ষেত্র জায়েজ বলেই ধরে নেই।
আসলে ২ ক্ষেত্রেই যে রাষ্ট্রের আইনের কাছে বিচারের জন্য তাদের ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিলো, সেটা আমাদের বোধের বাইরে। তাই নিজেরাই বিচারকারী হয়ে যাই।

এবার আসি রাষ্ট্র ও এর আইনব্যাবস্থা আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে। আইনের বইতে যা-ই লেখা থাকনা কেনো, তা সাধারণ মানুষ পড়ে দেখতে যায়না। বস্তবতা হলো, যেখানে রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারীরাই বিনা বিচারে ক্রসফায়ার করে হত্যা, গুম করছে, সেখানে মানুষ তো ভাববেই, সবাই মিলে চোর ডাকাত মেরে ফেলার আবার কিসের বিচার?
রাষ্ট্রবিরোধী আরেক পক্ষ যখন ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে জনগনের ওপর বিভিন্ন পন্থায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষ ক্রোধান্বিত হয়ে বিবেকবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে হিংস্র হয়ে যায়। মনে মনে এই ধারনা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, এই শ্বাপদসঙ্কুল জনপদে বেঁচে থাকাটাই চরম স্বার্থকতা।

এই মারো অথবা মরো পরিস্থিতিতে কে কতকাল টিকে থাকে, সেটাই এখন বিবেচনার বিষয়!

error: দুঃখিত!