৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বুধবার | রাত ১২:১৩
স্বাধীনতার মাসে মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেই চিরচেনা ব্যস্ততা, শিল্পকলায় শুনশান নীরবতা
খবরটি শেয়ার করুন:
57

মুন্সিগঞ্জ, ৩০ মার্চ ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর মুন্সিগঞ্জ শহরে নাটক, নৃত্যানুষ্ঠান, সঙ্গীতানুষ্ঠানসহ ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নজর কাড়ে। বেশিরভাগ অনুষ্ঠানই হয় জেলা শিল্পকলাকেন্দ্রীক। এ মাসটিকে ঘিরে আলাদা আবহ ও ব্যস্ততা দেখা যায় সংস্কৃতি কর্মীদের মাঝে। শিল্পকলা একাডেমি বা এর আশপাশের এলাকা থাকে জাঁকজমকপূর্ণ।

তবে, এবছর একেবারেই নিষ্প্রাণ দেখা গেছে এলাকাটি। মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও ছিলোনা চিরচেনা কোন ব্যস্ততা। স্বাধীনতার মাস হিসাবে বহুদিন ধরে চর্চিত মার্চ মাস শেষ হতে চললেও পুরোনো রীতি অনুযায়ী প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা বা সহযোগিতা না পাওয়ায় সেভাবে কোথাও কোন কর্মসূচি হয়নি বলে দাবি করেছে শীর্ষ সংগঠনগুলো।

সরকারি সহযোগিতার বাইরে সংগঠনের নিজস্ব উদ্যোগে যেসকল আয়োজন হয়ে থাকে সেগুলোও দেখা যায়নি এবার।

এ নিয়ে জেলার অন্তত ৭টি শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে কথা হলে তাদের কাছ থেকে এ চিত্র পাওয়া যায়।

প্রশাসনের অনাগ্রহের পাশাপাশি তারা বলছেন- রমজান, ও ঈদ পরবর্তী ছুটির পরিবেশের কারণে মার্চ মাস বা স্বাধীনতা দিবস কেন্দ্রীক অনুষ্ঠান আয়োজনে আগ্রহ কম ছিলো।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট মুন্সিগঞ্জের আহবায়ক আরিফ উল ইসলাম বলেন, বিগত বছরগুলোতে স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের আগে জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতিমূলক সভায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এবার আমাদের কাউকে ডাকা হয়নি। কেন ডাকা হয়নি সেটি আমার বোধগম্য নয়।

মুন্সিগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুব-উল-আলম স্বপন বলেন, মূলত মার্চ মাসজুড়ে রমজান ছিলো, আবার ঈদের পরপর ২৬ মার্চ। এজন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে শুধুমাত্র সংগঠনগুলো অংশ নিয়েছে। তবে আমরা আগামী পহেলা বৈশাখে একটি কর্মসূচি করবো।

জেলা নাট্য ঐক্য মঞ্চের সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ঢালী বলেন, এই পরিস্থিতির চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। জেলা প্রশাসন থেকে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখের কোন প্রস্তুতি বা আলোচনা সভার চিঠি আমরা সাংস্কৃতিক কর্মীরা পাই না। আগে আমরা এসব দিবসের চিঠি পেতাম। সেটা ব্যক্তি হিসাবেই হোক বা সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবেই হোক। কিন্তু এখন কোন কর্মসূচিতেই আর সাংস্কৃতিক কর্মীদের রাখা হয় না। এই যে এবার ২৬ মার্চ গেল একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জেলা প্রশাসন করেনি, এর চেয়ে দুঃখজনক আমাদের জন্য আর কি হতে পারে। গত পরশুদিন আমাদের বিশ্ব নাট্য দিবস ছিলো। সেখানে আমরা প্রায় ৪০টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ একসাথে হয়ে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছি।

অনিয়মিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক মাশফিক শিহাব বলেন, বরাবরই ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস বা এ মাসটি আমরা বিভিন্নভাবে উদযাপন করি। এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। আমরা দেখেছি যে, জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কোন আয়োজনই ছিলো না। যেই শিল্পকলা একাডেমিকে ঘিরে পুরো ২৬ মার্চ আলোকিত থাকে, সাংস্কৃতিক কর্মীদের পদচারণায় মিলনমেলায় রুপ নেয়, সেটি এবার অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো। সেখানে কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ আমরা দেখিনি। এখানে জেলা কালচারাল অফিসার দায় এড়াতে পারেন না, তিনি হয়তো জেলা প্রশাসনের সাথে আলাপালোচনা করতে পারেননি। ২৬ মার্চ বাঙালি জাতির বড় একটা জায়গা, যে জায়গাটা উদযাপন করা সংস্কৃতি কর্মীদের যেমন দায় তার থেকে বড় দায় হচ্ছে সকল বাঙালিদের। এ জায়গাটায় আমরা সকলেই ক্ষুব্ধ হয়েছি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাংস্কৃতিক আয়োজন বা স্বাধীনতা দিবস পালনে প্রশাসনের প্রস্তুতিমূলক সভায় কোন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণ ছিলো না বলে জানান জেলা কালচারাল অফিসার মো. এরশাদ হাসান। তিনি বলেন, এবার মুন্সিগঞ্জে স্বাধীনতা দিবস পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৭টি কমিটি করা হয়। এর মধ্যে একটি কমিটি ছিলো ‘রচনা, চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা’ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত। কমিটিতে সরকারি সংশ্লিষ্ট অফিসারদের বাইরে কোন সাংস্কৃতিক সংগঠন বা সংস্কৃতি কর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত চিঠির ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সাথে সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে এবার নির্দেশনা ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা আয়োজনের পরে যদি সুযোগ হয় তাহলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে এবং এটা জেলার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে। আমাদের মিটিংয়ে শুধু প্রতিযোগিতাটা রাখা হয়েছিলো। কিন্তু কালচারাল যে অনুষ্ঠান সেগুলো রাখা হয়নি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ মুছাব্বেরুল ইসলাম বলেন, এবার স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস পালনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে থেকে যে নির্দেশনা জেলা প্রশাসন বরাবর এসেছে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়টি না থাকায় জেলা প্রশাসন থেকে সেধরনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।