শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবে মুন্সিগঞ্জের ৩৫ মৃত্যুর ৫ বছর; আজও ঠিক হয়নি সেই নৌরুট
মুন্সিগঞ্জ, ৭ এপ্রিল ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
নদীমাতৃক বাংলাদেশের যাতায়াতের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নৌপথ। কিন্তু সেই নৌপথই যেন মুন্সিগঞ্জের মানুষের জন্য বারবার মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। একের পর এক লঞ্চডুবি, শোক, তদন্ত কমিটি—তারপর নীরবতা। সময় পেরোয়, কিন্তু বদলায় না কিছুই।
২০২১ সালের ৪ এপ্রিল, শীতলক্ষ্যা নদী-র কয়লাঘাট এলাকায় ঘটে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। কার্গো জাহাজ এসকেএল-৩-এর ধাক্কায় ডুবে যায় মুন্সিগঞ্জগামী লঞ্চ এমএল সাবিত আল হাসান। অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পানিতে তলিয়ে যায় শতাধিক যাত্রী বহনকারী লঞ্চটি। পরে উদ্ধার করা হয় অন্তত ৩৫ জনের মরদেহ—যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা।
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ট্র্যাজেডির স্মৃতি আজও তাজা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেছে—সেই নৌরুট কি নিরাপদ হয়েছে?
দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি: একই চিত্র, ভিন্ন দিন
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তার আগেও ২০২০ সালের জুনে বুড়িগঙ্গা নদী-তে ময়ূর-৭ লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায় মর্নিং বার্ড। সে ঘটনায় প্রাণ হারান ৩২ জন।
এরপরও শিক্ষা হয়নি। বরং একই চিত্র পুনরাবৃত্তি হয়েছে ২০২২ সালের মার্চে। আবারও শীতলক্ষ্যা নদী-তেই, কয়লাঘাটের কাছাকাছি এলাকায় কার্গো জাহাজ এমভি রূপসী-৯-এর ধাক্কায় ডুবে যায় মুন্সিগঞ্জগামী আরেকটি লঞ্চ এমএল আশরাফউদ্দিন। অর্ধশত যাত্রীর মধ্যে অন্তত ৭ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়, নিখোঁজ থাকেন আরও কয়েকজন।
প্রতিটি ঘটনার পরই গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি, আটক হয়েছে দায়ী জাহাজ। কিন্তু বাস্তবতায় পরিবর্তন? প্রশ্নের উত্তর এখনো নেতিবাচক।
সমস্যার মূল: নৌপথে বিশৃঙ্খলা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ নৌরুট দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এই রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ, বাল্কহেড, কার্গো জাহাজ—সবকিছু একই সঙ্গে চলাচল করে। নেই কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নেই আলাদা লেন।
অতিরিক্ত গতিতে কার্গো জাহাজ চলাচল, দক্ষ নাবিকের অভাব, নৌযানের ফিটনেস তদারকির দুর্বলতা, নদীপথে পর্যাপ্ত সিগন্যালিং বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাব, ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যার মোহনায় যত্রতত্র জাহাজ নোঙর করে রাখা এসব কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে আগের মতই চলাচল করছে মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জগামী লঞ্চগুলো।
প্রতিশ্রুতির রাজনীতি বনাম বাস্তবতা
প্রতিবার দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করেন নেতারা। দেওয়া হয় আশ্বাস—“ব্যবস্থা নেওয়া হবে”, “দোষীদের শাস্তি হবে”, “নৌপথ নিরাপদ করা হবে”। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কয়েকদিন পর সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়।
মুন্সিগঞ্জের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। অনেকেই বলেন, “আমরা মরলে তারা শোক জানায়, কিন্তু আমাদের বাঁচানোর জন্য কিছুই করে না।”
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি
দুর্ঘটনার পর দায় চাপানো হয় চালকের ওপর, কখনো মালিকের ওপর। কিন্তু বৃহত্তর ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার দায় কেউ নেয় না। প্রশাসন, নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাঁচ বছর আগে ৩৫টি প্রাণহানির পর যে প্রশ্ন উঠেছিল, আজও সেই প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসে—এই নৌরুট কি নিরাপদ হয়েছে? আলাদা লেন বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কি চালু হয়েছে? লঞ্চগুলো কি পরিবর্তন করা হয়েছে? মাঝে একবার সি-ট্রাক চালু হলেও এখনো কি আছে? দায়ীদের শাস্তি কি নিশ্চিত হয়েছে? বাস্তবতা বলছে—না।
মুন্সিগঞ্জের মানুষের জন্য নৌপথ শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, জীবনের অংশ। কিন্তু সেই পথই যদি বারবার মৃত্যুর কারণ হয়, তবে তা শুধু দুর্ঘটনা নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনার ফল।
প্রতিবার লঞ্চ ডোবে, মানুষ মরে, শোক প্রকাশ হয়—তারপর সব ভুলে যাওয়া হয়।
এই চক্র ভাঙা না গেলে, হয়তো আবারও কোনো এক সকালে খবর আসবে—আরেকটি লঞ্চ ডুবেছে, আবারও হারিয়েছে কিছু প্রাণ।

