লঞ্চ ডুবি; নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছিলেন মা
188

মুন্সিগঞ্জ, ৬ এপ্রিল, ২০২১, প্রধান প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই তুচ্ছ, এমনকি মৃত্যুও! এটিই যেন আরেকবার প্রমাণ করে দিয়ে গেলেন মুন্সিগঞ্জের বীথি আক্তার।

বীথি তার ১ বছরের মেয়ে আরিফা কে নিয়ে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জে একটি বেসরকারী ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য। সন্ধ্যা ৬ টা’র দিকে তিনি নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ ঘাট থেকে শাশুড়ি ও মেয়ে কে নিয়ে মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা এম এল সাবিত আল হাসান লঞ্চটিতে উঠেন। ১০-১৫ মিনিট পরই নির্মম দূর্ঘটনার শীকার হয় লঞ্চটি। মুহুর্তেই লঞ্চটি নদীর তলদেশে তলিয়ে যায়। ততক্ষণে বীথি হয়তো নিশ্চিত মৃত্যু মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার এক বছরের শিশু? বীথি তাকে আগলে রেখেছিলেন বুকে। টানা ১৮ ঘন্টা পর লঞ্চ উদ্ধারের পরও এক মুহুর্তের জন্যও বীথির বুক থেকে আরিফা বিচ্ছিন্ন হয়নি। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও পরম মমতায় সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছিলেন মা।

জানা যায়, গত রোববার (৪ এপ্রিল) নারায়ণগঞ্জে মুন্সিগঞ্জের লঞ্চ ডুবির ঘটনায় গতকাল লঞ্চ উদ্ধারের পরে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার খাসকান্দি রমজানবেগ এলাকার বীথি আক্তার (২৫) তার এক বছরের মেয়ে ও শাশুড়ি পাকিজা বেগমের মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ঐ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় নিহত বীথির পরিবার। নিহত বীথির স্বামী আরিফ ডেকোরেটরের লাইট মিস্ত্রির কাজ করেন। মা, স্ত্রী ও সন্তান হারিয়ে তিনি শোকে বিহ্বল তিনি।

এ ঘটনায় আজ মঙ্গলবার (৬ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত মোট ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লঞ্চে থাকা আনুমানিক কমপক্ষে ৩০ জন দূর্ঘটনার পরপর সাতরে পারে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। আর এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অন্তত আরও ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। ধারনা করা হচ্ছে লঞ্চটিতে ৬৫-৭০ জন যাত্রী ছিলো। এ ঘটনায় আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত ঘাতক জাহাজটিকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পুলিশ ঘাতক জাহাজটি উদ্ধারে তৎপর রয়েছে। নিহত প্রত্যেক পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক অবস্থায় দাফন-কাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে।

আরও যাদের জীবন গেলো

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৯ জনের নাম পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন, মুন্সিগঞ্জ সদরের উত্তর চর মসুরা এলাকার সখিনা বেগম (৪৫), একই এলাকার বিথী (১৮) ও তার এক বছর বয়সী মেয়ে আরিফা, দোলা বেগম (৩৪), মুন্সিগঞ্জ সদরের রুনা আক্তার (২৪), মুন্সিগঞ্জ মোল্লাকান্দির সোলেমান বেপারী (৬০) ও তার স্ত্রী বেবী বেগম (৬০), মুন্সিগঞ্জ মালপাড়ার হারাধন সাহার স্ত্রী সুনিতা সাহা (৪০) ও তার ছেলে বিকাশ (২২), মুন্সিগঞ্জ সদরের প্রীতিময় শর্মার স্ত্রী প্রতিমা শর্মা (৫৩), মুন্সিগঞ্জ চর কিশোরগঞ্জের মোঃ শামসুদ্দিন (৯০) ও তার স্ত্রী রেহেনা বেগম (৬৫), বরিশালের উটরা উজিরপুরের হাফিজুর রহমান (২৪), তার স্ত্রী তাহমিনা (২০) এবং এক বছর বয়সী শিশুপুত্র আবদুল্লাহ, মুন্সিগঞ্জ দক্ষিণ কেওয়ারের নারায়ণ দাস (৬৫) ও তার স্ত্রী পার্বতী দাস (৪৫), নারায়ণগঞ্জের বন্দরের কল্যান্দী এলাকার আজমির (২) (ঘটনার সময় সে দাদা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ছিলো, দাদা সাইফুল বেঁচে গেছেন), মুন্সিগঞ্জ সদরের শাহ আলম মৃধা (৫৫), একই এলাকার মহারানী (৩৭), ঢাকার শনির আখড়া এলাকার আনোয়ার হোসেন (৪৫), তার স্ত্রী মাকসুদা বেগম (৩০) ও তাদের ৭ মাস বয়সী মেয়ে মানসুরা, মুন্সিগঞ্জ সদরের ছাউদা আক্তার লতা (১৮), শরিয়তপুরের নড়িয়ার আবদুল খালেক (৭০), ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার মোছাঃ জিবু (১৩), মুন্সিগঞ্জের খাদিজা বেগম (৫০), নারায়ণগঞ্জের বন্দরের দক্ষিন সাবদির নুরু মিয়ার ছেলে মোঃ নয়ন (১৯) ও সাদিয়া (১১)।

লঞ্চডুবির ঘটনায় জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরীকে আহবায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ পুলিশের প্রতিনিধি এবং সদরের ইউএনওকে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে লঞ্চডুবির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও এর দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে  সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুছ ছাত্তার শেখ। কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) মো. রফিকুল ইসলাম। আর কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন – নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জসিম উদ্দিন সরকার,  বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) প্রধান প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নিম্নে নহে), ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি এবং নৌ পুলিশের একজন প্রতিনিধি।

 

 

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ