৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
মঙ্গলবার | রাত ১১:২৪
মুন্সিগঞ্জে সরকারি কর্মচারীর ‘ঘুষ নেয়া’র ভিডিও নিয়ে সংবাদ, দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
খবরটি শেয়ার করুন:
86

মুন্সিগঞ্জ, ৫ এপ্রিল ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, আলোচিত স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমানের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিওর সূত্র ধরে স্থানীয় ‘দৈনিক মুন্সীগঞ্জের সময়’ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক আবু সাঈদ সৌরভ ও পত্রিকার সম্পাদক মঈনউদ্দিন আহমেদ সুমনের বিরুদ্ধে মানহানি ও চাঁদাবাজির মামলার আবেদন পড়েছে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নং আমলী আদালতে।

আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে তদন্তের জন্য সদর থানা বরাবর পাঠিয়েছে।

মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ওসি (তদন্ত) সজীব দে আবেদনটি থানায় প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, তদন্ত সংক্রান্ত পরবর্তী কার্যক্রম থানা পুলিশ গ্রহণ করবে।

প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণকারী স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমানের দুর্নীতি-অনিয়মের খবর নতুন নয়। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশ হলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি কখনো।

সবশেষ দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার আবেদনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমে কর্মরত পেশাদার সাংবাদিকরা। এ ধরনের মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতের আরও সংবেদনশীল হওয়ার অনুরোধ করেছেন তারা।

মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক মানবজমিনের সাংবাদিক গোলজার হোসেন বলেন, অপকর্মকারীদের শাস্তির বদলে তাদের অপরাধ তুলে ধরায় যদি সাংবাদিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থায় আঘাত আসে। এ ধরনের ঘটনা বর্তমান সরকারের অবস্থানের সাথেও সাংঘর্ষিক। আমি এর নিন্দা জানাই।

মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের সাংবাদিক আরিফ উল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হচ্ছে গণমাধ্যম। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, যার উপর মুন্সিগঞ্জের লাখ লাখ মানুষের নিরাপত্তা তথা জীবনমান, স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভরশীল সেখানকার একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর অনিয়ম-দুর্নীতি প্রকাশ সরা সাংবাদিকদের জন্য শুধু দায়িত্বই নয়। আমি মনে করি, কর্তব্য। সেই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে গিয়ে যদি মামলায় পড়তে হয় তা অত্যন্ত দুুঃখজনক এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি।

মুন্সিগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা আমার বিক্রমপুরের প্রকাশক ও স্টার নিউজ টেলিভিশনের সাংবাদিক শিহাব আহমেদ বলেন, গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা দেখেছি সত্যপ্রকাশে সাংবাদিকদের সামনে বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানারকম আইন করে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। সেরসম পরিবেশ থেকে আমরা উত্তরণ চেয়েছি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রেস কাউন্সিল আছে, আগে সেখানে অভিযোগ করতে হবে। সরাসরি মামলা করা এবং আদালত কতৃক সেটি গ্রহণ করা ইতিবাচক নজির নয়। আমি এর প্রতিবাদ জানাই।

এদিকে, মিজানুর ধারাবাহিকভাবে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর ২৩ তারিখে ওমরাহ হজ্বের কথা বলে ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে সৌদি আরবে যান তিনি। অক্টোবর মাসের ৭ তারিখ দেশে ফিরে আসার কথা থাকলেও তিনি আসেন ১ বছর ১ মাস ৫ দিন পর ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর। ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ১০ দিনের সময় দিয়ে শোকজ করে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু এরপর এ বিষয়ে আর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মিজান রয়ে যান বহাল তবিয়তে।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, মিজানুরের দুর্নীতি-অপকর্মের বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চরকেওয়ার এলাকার বাসিন্দা মো. গজনবী সিকদার দূর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ২০২৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, সৌদি আরবে স্বর্ণ চোরাচালান করতে গিয়ে ধরা খেয়ে প্রায় ১ বছর জেল খাটেন মিজান। আবেদনে পাসপোর্ট, ভিসা নাম্বার ও সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কেস নাম্বার উল্লেখ আছে। এছাড়া নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে মিজানের। ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, মিজান তার বাবার কাছ থেকে অল্প কিছু সম্পদ পেলেও গ্রামের বাড়ি চরকেওয়ারে ১৫-২০ বিঘা জমি রয়েছে। শহরের মাঠপাড়ায় ৪টি প্লট রয়েছে তার, এছাড়া ৬তলা বিশিষ্ট একটি ভবন রয়েছে সেখানেই। এর বাইরেও তার কাছে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

হয়রানির শিকার দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ও মুন্সীগঞ্জের সময়ের সাংবাদিক আবু সাঈদ সৌরভ বলেন, এত দুর্নীতি- অনিয়ম ও প্রকাশ্যে ঘুষের ভিডিও ভাইরালের পরও স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমান সবকিছু ম্যানেজ করে প্রায় ৩৫ বছর যাবৎ মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে দাপটের সাথে চাকরি করে যাচ্ছেন। তাহলে এখন প্রশ্ন আসে তার খুঁটির জোর কোথায়? তিনি যে মামলার আবেদন করেছেন সেটি আমরা আইনিভাবেই মোকাবিলা করবো। পাশাপাশি তার অপকর্মের বিষয়ে প্রতিবেদনও থামবে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টেনোটাইপিস্ট মিজানুর রহমান বলেন, আমি স্যারের চাকরি করি। স্যারের অনুমতি ছাড়া কোন কথা বলবো না।

পরে এ নিয়ে মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন কামরুল জমাদ্দারের মন্তব্য জানতে চাইলে ঘুষ- অনিয়ম নিয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি তিনি।