আমার বিক্রমপুর ছাড়লেন শিহাব আহমেদ, যোগ দিলেন স্টার নিউজ-এ
মুন্সিগঞ্জ, ১০ আগস্ট ২০২৫, ডেস্ক রিপোর্ট (আমার বিক্রমপুর)
মুন্সিগঞ্জ ও ঢাকা বিভাগের জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা আমার বিক্রমপুর ছেড়েছেন পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাংবাদিক শিহাব আহমেদ। গত জুলাই থেকে তিনি দেশের দশম সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল স্টার নিউজ-এ মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দিয়েছেন।
স্টার নিউজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করেছে। পাশাপাশি টেলিভিশনে পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচারের জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে মুন্সিগঞ্জসহ সারাদেশে টেলিভিশনে এর পরীক্ষামূলক সম্প্রচার দেখা যাচ্ছে। আগামী কয়েকমাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গরুপে শুরু হচ্ছে পুরোপুরি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল- স্টার নিউজ।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট আমার বিক্রমপুর পত্রিকাটি শিহাব আহমেদের হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি পত্রিকাটির প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন, ২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি পত্রিকাটির প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, ২০২২ সালের শুরু থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনি পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক হিসেবে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি পত্রিকাটির সম্পাদক হিসাবে কাজ করছিলেন।
শিহাব আহমেদ দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করেন। তার রাজনৈতিক অতীত পরিচয় নিয়ে সমালোচনা থাকলেও তিনি নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করার চেষ্টা, জনগণের কথা তুলে ধরার চেষ্টা ও সাংবাদিকতায় সাহসী ভূমিকার জন্য প্রশংসনীয়। অলিখিত-অপ্রকাশিত বিষয়, অপরাধ ও সামাজিক ইস্যুর প্রতি তার আগ্রহ বেশি।
অক্টোবর ২০১৫ সালে মাদকবিরোধী প্রতিবেদনের জন্য তার উপর হামলা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে মিরকাদিম পৌরসভা নির্বাচনে ৮নং ওয়ার্ডের হাজী আমজাদ আলী কলেজ মাঠে ভোটকেন্দ্রের সামনে ‘নির্বাচনী অনিয়ম’ ধারণ করার সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তার উপর হামলা করে মোবাইল ছিনিয়ে নেয়।
২০১৬ সালে মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি করা অবস্থায় শিপন পাটোয়ারি নামের এক যুবলীগ নেতার ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমার বিক্রমপুর। এর জেরে শিহাব আহমেদকে তুলে নিয়ে মারধর ও জিম্মি করে আপত্তিকর ছবি তুলে রাখে ক্ষুব্ধ পক্ষটি। এর জেরে ২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ছাত্রাবাসের কলেজ শাখা ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি নিবিরের রুমে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করে পুলিশ।
২০১৮ সালে তৎকালীন মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ফয়সাল বিপ্লব কতৃক পৌর মার্কেটের টয়লেটগুলোকে দোকানে রুপান্তর করে বিক্রি করে দেয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে শিহাব আহমেদ ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অস্ত্রের মুখে তাকে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে মানিকপুরের চিহ্নিত অস্ত্রধারী, যুবলীগ নেতা রুবেল ওরফে ‘ব্ল্যাক রুবেল’। এসময় তাকে পিস্তলের বাট ও হেলমেট দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়।
২০১৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘মুন্সিগঞ্জে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসার মূলহোতা কারা?’ শিরোনামে আমার বিক্রমপুর পত্রিকায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হলে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে’ মামলার শিকার হন শিহাব আহমেদ। পরে ২০২৩ সালের ১৭ মে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জুলফিকার হায়াত তাকে মামলা থেকে নিঃশর্ত অব্যাহতি দেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে চলতি বছরের ১০-১১ মে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাটে দু’জন তরুণীকে প্রকাশ্যে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আমার বিক্রমপুর তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করে।
এতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সমর্থক দাবিদার একটি গোষ্ঠী মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবে ঢুকে শিহাব আহমেদকে হুমকি দেয়। এসময় তারা ‘দেখে নেওয়া’ ও ‘সংবাদ কিভাবে করতে হবে’ নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে ওই পক্ষটি ১৬ মে মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে শিহাব আহমেদের ছবি ব্যবহার করে আমার বিক্রমপুর বন্ধের দাবিতে ‘মুন্সিগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি করে।
২২ মে আমার বিক্রমপুর বন্ধের হুমকির প্রতিবাদে আরেকটি মানববন্ধন হয় একই জায়গায়। যেখানে মুন্সিগঞ্জের জুুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য ও আহত গেজেটেড জুলাই যোদ্ধারা উপস্থিত থেকে পত্রিকা বন্ধের হুমকি ও প্রতিবাদ করেন।
সাংবাদিকতার জন্য হয়রানি ও হুমকির মুখেও আমার বিক্রমপুর অটল- ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কতৃক অভিবাসন সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে ‘ওকাপ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২০’ গ্রহণ করেন তৎকালীন আমার বিক্রমপুর সম্পাদক শিহাব আহমেদ।
২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর উদ্যোগে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ-এর আয়োজনে ‘যুবদের জন্য উন্নয়ন সাংবাদিকতা’ শীর্ষক কর্মশালায় অর্থনীতিবিদ ও গণনীতি বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য’র কাছ থেকে সনদ গ্রহণ করেন তৎকালীন আমার বিক্রমপুর সম্পাদক শিহাব আহমেদ।
আমার বিক্রমপুর ছাড়াও শিহাব আহমেদ কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে। সেগুলো হলো- দৈনিক বাংলা, নিউজ ২৪ ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
স্টার নিউজ-এ যোগদানের মধ্য দিয়ে আমার বিক্রমপুরে তার সাংবাদিকতা শেষ হলো। গত জুলাই থেকে তিনি পত্রিকাটির সাথে সংশ্লিষ্ট নন। লাইভ-ভয়েস বা আমার বিক্রমপুরের অন্য কোন কর্মকাণ্ডে তাকে আর দেখা যাবে না।
২০১৫ সালের ১১ আগস্ট থেকে ‘সত্যই শক্তি’ স্লোগান নিয়ে ওয়েবসাইট, ইউটিউব এবং জনপ্রিয় ও সমাদৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে আমার বিক্রমপুর। বর্তমানে এর মাসিক ওয়েব ভিজিটরের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ, ইউটিউবে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ১৬,৭০০ ও ফেসবুক অনুসারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি। আমার বিক্রমপুর প্রতি মাসে ৫০-৬০ লাখ পাঠকের কাছে পৌঁছায়- এই হিসাব ফেসবুকের।
আমার বিক্রমপুর ২০২০ সালে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত ৪৫ জনকে ‘গুনীজন সম্মাননা’ দেয়। একইবছর বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডি টুর্নামেন্টের আয়োজন করে আমার বিক্রমপুর।
তবে, পত্রিকাটি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এখনও স্বনির্ভর নয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি এখনো ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও অনুদাননির্ভর।
আমার বিক্রমপুর স্থানীয় অপরাধ, সামাজিক সমস্যা, অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জনদুর্ভোগ কেন্দ্রিক সংবাদে বেশি প্রাধান্য দেয়। এর নানামুখী প্রভাব থাকায় প্রভাবশালীরা অনেক সময় চাপ সৃষ্টি করেন ও পত্রিকা বন্ধের হুমকি দেন। শুধু লিখিত নয়, ভিডিও ও ছবিসহ প্রতিবেদন করে থাকে আমার বিক্রমপুর। যা যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রভাব তৈরি করে।


