৩৩ বছর ধরে বাংলা গানের জনপ্রিয় শিল্পী মুন্সিগঞ্জের সন্তান বালাম
৬০২

মুন্সিগঞ্জ, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

বাংলা গানের ভুবনে তিন দশকের বেশি সময় ধরে নিজের আলাদা জায়গা ধরে রেখেছেন বালাম। গায়ক, গিটারিস্ট, সুরকার ও সংগীত পরিচালক—বহুমাত্রিক পরিচয়ে দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান। সময়ের সঙ্গে বাংলা গানের ধরন বদলেছে, বদলেছে শ্রোতার রুচিও; কিন্তু বালামের গান এখনও ফিরে আসে শ্রোতার প্লেলিস্টে।

সংগীতজীবনের ৩৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২৬ সালে সুইডেনে একক কনসার্টও করেছেন এই শিল্পী। ‘সেলিব্রেটিং থার্টি-থ্রি ইয়ার্স অব বালাম’স মিউজিক্যাল জার্নি—লাইভ ইন স্টকহোম’ শিরোনামের ওই আয়োজনে তিনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জনপ্রিয় গানগুলো পরিবেশন করেন।

তবে বালামের পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—তিনি মুন্সিগঞ্জের সন্তান। তাঁর পৈতৃক বাড়ি মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার ধামারণ গ্রামে। সংগীতের জাতীয় অঙ্গনে দীর্ঘদিনের পরিচিত এই শিল্পীর শিকড় তাই বিক্রমপুরের মাটিতেই।

গানের পরিবেশেই বেড়ে ওঠা

বালামের সংগীতের প্রতি ভালোবাসার শুরু ছোটবেলা থেকেই। তাঁর পরিবারেও সংগীতচর্চার পরিবেশ ছিল। মা-বাবা, ভাই, চাচা, ফুফু ও কাজিনদের অনেকেই গান করতেন বলে ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়। স্কুলজীবনে গিটার বাজানোর প্রতি তৈরি হয় বিশেষ আগ্রহ।

নিজের এক সাক্ষাৎকারে বালাম জানিয়েছিলেন, স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে গিটার বাজাতেন। ধীরে ধীরে শখের সেই গিটারই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান সঙ্গী।

গিটারের প্রতি তাঁর টান ছিল এতটাই গভীর যে কৈশোরেই দিনের দীর্ঘ সময় গিটার বাজিয়ে কাটাতেন। ২০১০ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় গিটার বাজানো শুরু করেন এবং প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গিটার নিয়ে থাকতেন।

ব্যান্ড থেকে পেশাদার সংগীতজীবন

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি বালামের সংগীতজীবনের পেশাদার অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে তিনি ‘Renegades’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হন গিটারিস্ট ও ভোকাল হিসেবে। পরবর্তী সময়ে ব্যান্ডটি ‘Onno Bhubon’ ও ‘Firiye Dao’ নামে অ্যালবাম প্রকাশ করে।

১৯৯৮ সালে বালাম যোগ দেন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেইজে। সেখানে গিটারিস্ট ও ভোকাল হিসেবে তাঁর কাজ তাঁকে ব্যান্ডসংগীতের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে তোলে। ২০০৭ সাল পর্যন্ত ওয়ারফেইজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

এরপর শুরু হয় একক বালামের নতুন অধ্যায়।

‘বালাম’ দিয়ে একক পরিচয়ের বিস্ফোরণ

২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘বালাম’। অ্যালবামটি প্রকাশের পর দ্রুতই তিনি একক শিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর একে একে আসে ‘বালাম ২’ ও ‘বালাম ৩’। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভুবন’।

‘এক মুঠো রোদ্দুর’, ‘নেশা’, ‘একাকী মন’, ‘তোমার জন্য’, ‘নুপুর বাজে’, ‘সঙ্গী হবে কি’, ‘রিমঝিম’ ও ‘অপরূপা’র মতো গান শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।

বিশেষ করে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি ও শেষভাগে যারা বাংলা আধুনিক গান শুনে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে বালামের গান হয়ে ওঠে সময়ের একটি পরিচিত সাউন্ড। তাঁর গায়কীতে ছিল কোমলতা, আর গিটারনির্ভর সংগীতায়োজনে ছিল নিজস্বতা। এ কারণে প্রচলিত আধুনিক গানের বাইরে তাঁর একটি আলাদা শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি হয়।

বিরতি, ব্যক্তিজীবন ও আবার ফিরে আসা

সংগীত ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময়ের পর একপর্যায়ে বালাম গান থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। ২০২৩ সালে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, স্ত্রী অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে দেখাশোনার জন্য সংগীত থেকে বিরতি নিয়েছিলেন।

দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর পুরোনো গানগুলো আবার নতুন করে শ্রোতাদের কাছে ফিরে আসতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগে পুরোনো গান নতুন শ্রোতার কাছেও পৌঁছায়। বালাম নিজেও তাঁর পুরোনো গান শেয়ার করতে শুরু করেন।

এরপর ২০২৩ সালের ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার গান ‘ও প্রিয়তমা’ তাঁকে আবারও ব্যাপক আলোচনায় নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে ‘রাজকুমার’ গানও শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে।

এক যুগ পর নতুন অ্যালবাম

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে নতুন একক অ্যালবাম নিয়ে ফেরার ঘোষণা দেন বালাম। ‘মাওলা’ নামে ছয়টি গান নিয়ে সাজানো এই অ্যালবামটি তাঁর পঞ্চম একক অ্যালবাম। অ্যালবামের গানগুলোর সুর ও সংগীতায়োজনের কাজও তিনি নিজেই করেছেন।

অর্থাৎ তিন দশকের বেশি সময়ের সংগীতজীবনে বালামের পথচলায় যেমন আছে ব্যান্ডসংগীতের সময়, তেমনি আছে একক শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তার শিখর, দীর্ঘ বিরতি এবং নতুন করে ফিরে আসার গল্প।

তিন প্রজন্মের শ্রোতার শিল্পী

বালামের সংগীতজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো—তাঁর শ্রোতার বয়সের বিস্তৃতি। নব্বইয়ের দশকে যাঁরা তাঁর গিটার হাতে ব্যান্ডসংগীতের পথচলা দেখেছেন, দুই হাজারের দশকে যাঁরা ‘বালাম’ অ্যালবামের গান শুনেছেন, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে ‘ও প্রিয়তমা’ ও ‘রাজকুমার’ শুনে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন—সবাই তাঁর সংগীতজীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।

নিজের সংগীত নিয়ে বালাম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পরিকল্পনা করে তিনি গানে আসেননি; ভালোবাসা থেকেই ধীরে ধীরে গান তাঁর পেশায় পরিণত হয়েছে।

৩৩ বছরের এই পথচলায় তাই বালামের গল্প শুধু একজন গায়কের জনপ্রিয়তার গল্প নয়। এটি একটি প্রজন্মের সংগীত-স্মৃতিরও অংশ। আর সেই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর ধামারণ গ্রামের নাম—যেখান থেকে উঠে আসা একজন শিল্পী তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা গানের শ্রোতাদের সঙ্গে নিজের সুরের সম্পর্ক ধরে রেখেছেন।

সময় বদলেছে, সংগীতের মাধ্যম বদলেছে, শ্রোতার অভ্যাস বদলেছে। কিন্তু বালামের গান বারবার ফিরে এসেছে নতুন কোনো উপলক্ষ্যে, নতুন কোনো শ্রোতার কাছে। ৩৩ বছরের সংগীতযাত্রা পেরিয়ে তাঁর সামনে এখন নতুন গান, নতুন শ্রোতা এবং সংগীতের আরও একটি অধ্যায়ের অপেক্ষা।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ