২৮শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
শনিবার | রাত ২:২১
মুন্সিগঞ্জের গর্ব; শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদ
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২২, আমার বিক্রমপুর ডেস্ক (আমার বিক্রমপুর)

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে ক’জন সাংবাদিক স্বাধীনতার বেদিমূলে জীবন উৎসর্গ করেন মুন্সিগঞ্জের কৃতি সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদ তাঁদের অন্যতম।

একসময়ের রাজনৈতিক কর্মী নিজামুদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদ মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ইউনিয়নের মাওয়া গ্রামে ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম দাদন।

তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলাম ছিলেন জাহাজের অডিট অফিসার আর মা ফাতেমা বেগম গৃহিনী। ছোট কাকা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের একজন প্রখ্যাত ভূতাত্ত্বিক, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকার আরমানীটোলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে। সিরাজুল ইসলাম ও ফাতেমা বেগমের চার ছেলে-মেয়ে। শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত পরিবারটির অন্য তিন সন্তান হলেন- সুলতানউদ্দিন আহমদ, মিনহাজউদ্দিন আহমদ ও সুরাইয়া বেগম ডালিম।

শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদের স্মারক ডাকটিকেট।

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রসর পরিবারের সদস্যরা মিলে বাড়িতে নাটক, গান আর আবৃত্তির আয়োজন করতেন।

শিক্ষাজীবনের শুরু পারিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মাওয়া প্রাইমারি স্কুলে। পরে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন কাজীর পাগলা অভয় কুমার তালুকদার ইনস্টিটিউটে। ১৯৪৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেন শ্রীনগরের ভাগ্যকুল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরের সরকারি হরগঙ্গা কলেজে।১৯৪৮ সালে সেখান থেকে ইন্ডারমিডিয়েট পাশ করেন তিনি।

স্কুলজীবন থেকেই নিজামুদ্দীন ছিলেন তুখোড় সাঁতারু। কখনো-কখনো ঝাঁপিয়ে পড়তেন উন্মত্ত পদ্মায়। সাঁতরে চলে যেতেন নদীর মাঝখানে। মা শুনে দৌঁড়ে আসতেন। ডাকতেন ছেলেকে, আর যেন সামনে না যায়। মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি আবার পাড়ে ফিরতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও তিনি সাঁতার কাটা অব্যাহত রাখেন। সাঁতারে বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যাম্পিয়নের মুকুট তুলে নেন। পুরস্কার লাভ করেন প্রাদেশিক প্রতিযোগিতাতেও।

হরগঙ্গা কলেজের ছাত্র থাকাবস্থায় তিনি সম্পৃক্ত হন রাজনীতিতে। কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন কোরবান আলী আর শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, যাঁরা পরে জাতীয় রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন। তবে নিজামুদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকে যুক্ত হন সাংবাদিকতা, সাঁতার আর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় শহীদ সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় নিজামুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকতা শুরু করেন। করাচি থেকে প্রকাশিত ‘সিভিল এন্ড মিলিটারি গেজেট’ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন ১৯৫০ সালে। এরপর দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক আজাদ, ঢাকা টাইমস, পাকিস্তান অবজারভার, এপিপি, এএফপি, রয়টার, ইউপিআই নামক সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থায় কাজ করেন। ১৯৫৮ সালে এপিপি প্রথম বারের মতো পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়। নিজামুদ্দীন ঢাকায় এপিপি’র প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন।

১৯৫৯ সালে যোগ দেন পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (পিপিআই)-এ। তখন সংবাদ সংস্থাটির ঢাকায় কোনো অফিস ছিল না। নিজামুদ্দীন কাজ করতেন নিজের বাসাতেই। সংবাদ লেখা শেষ হলে নিজেই সাইকেলে করে পোস্ট অফিসে গিয়ে তা করাচিতে পাঠাতেন। পরে ঢাকায় গড়ে তোলেন পিপিআইয়ের ঢাকা অফিস। ১৯৬৪ সালে তিনি পিপিআইয়ের সম্পাদক হন। ১৯৬৯ সালে তিনি পিপিআইয়ের জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব পান। মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তিনি দক্ষতার সঙ্গে জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন।

পিপিআই-তে কাজ করার সময় তিনি বেশ কয়েকটি বিদেশি সংবাদ সংস্থায় পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি যক্ষ্মা সমিতি, কেন্দ্রীয় পাট বোর্ড, সেন্সর বোর্ডসহ বিভিন্ন সমিতি ও সংস্থার সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৭০ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ২৫তম অধিবেশনে যোগ দেন।

পিপিআই অফিস এক সময় হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগের সান্ধ্যকালীন আড্ডার স্থান। সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা চলত। রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকাটা ছিল সাময়িক। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পর আবার ফিরে এসেছিলেন রাজনীতিতে। ১৯৬১ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে নির্বাচন দিলেন। নিজামুদ্দীন আহমদ সে নির্বাচনে অংশ নিলেন কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে। পশ্চিম বিক্রমপুর থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন তিনি।

কলেজ জীবনে রাজনীতির সংস্পর্শে আসা নিজামুদ্দীন ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৫৮’র রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা, ৬৯’এ ছাত্রদের ১১ দফা ও গণঅভ্যুত্থানে কখনো সক্রিয় বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এসব আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত। এসব খবর বিদেশি সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে পাঠাতেন নিজামুদ্দীন।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারায় বিকশিত এসব আন্দোলনে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে। এসময় তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের সব রাজনৈতিক খবর সরবরাহ করতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর।

২৫শে মার্চ কালোরাত্রির আগে সোয়াত জাহাজে করে চট্টগ্রামে অস্ত্র আনার বিষয়টিও তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানান। নিজামুদ্দীন এ সংবাদটি প্রথম পান অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি)-এর মাধ্যমে।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেওয়ার পরপরই নিজামুদ্দীন আহমদ বাসায় কালো পতাকা উত্তোলন করেন। সেসময় ঢাকায় কর্মরত একজন মার্কিন সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়েছিল। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে তিনি দেশে ফেরার পথে বিমানবন্দরে ডেকে নেন তাঁকে। সেখানে মার্কিন সাংবাদিকটি নিজামুদ্দীনকে বলেছিলেন, ‘অচিরেই পূর্ব পাকিস্তানে রায়ট হবে’। রায়ট বলতে বন্ধুটি তাঁকে কি বলতে চেয়েছিলেন
নিজামুদ্দীন সেদিন তা বুঝতে পারেননি।

একাত্তরের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে গণহত্যা শুরু করে। সেদিন রাত ৯টা পর্যন্ত নিজামুদ্দীন নিজের অফিসেই ছিলেন। রাত ৮টার দিকে তাঁকে ফোন করেন আওয়ামী লীগ নেতা মো. কামরুজ্জামান (১৯৭৫-এর ৩রা নভেম্বর জেলহত্যার শিকার)।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ততক্ষণে ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে। কামারুজ্জামান জানতে চান সার্বিক পরিস্থিতি। নিজামুদ্দীন শুধু বললেন, যে যেভাবে পারেন এখনই আত্মগোপনে চলে যান।

ফোনালাপের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন নিজামুদ্দীন আহমদের ছোট ভাই মিনহাজউদ্দিন আহমদ। ফোন রেখে ছোটভাইকে পরিস্থিতি বর্ণনা করেন নিজামুদ্দীন।

২৫শে মার্চ রাতে বাসার সকলকে নিয়ে নিজামুদ্দীন বারান্দাতেই কাটিয়ে দিলেন। খুব ভোরে তিনি ছোট একটা রেডিও নিয়ে বাইরে যেতে তৈরি হন। স্ত্রী রেবা তাতে বাধা দেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। তিনি বেরিয়ে গেলেন কোথায়, কি হলো সে খবর সংগ্রহ করতে। তাছাড়া অফিসের স্টাফদের কার কী অবস্থা তাদের খবরও নিতে হবে।

বাইরে গিয়ে তিনি দেখলেন, ঢাকা যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। যতটা সম্ভব সংগ্রহ করলেন গণহত্যার সংবাদ। সেগুলো পাঠালেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। এরপর বাসায় ফিরে স্ত্রী রেবাকে জানালেন, রাস্তায়রাস্তায় পড়ে আছে লাশ। ঘরে-ঘরে ঢুকে বাঙালিদের হত্যা করা হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণও বাদ পড়েনি পৈশাচিকতা থেকে।

পরের দিন থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রকাশে আরও উদ্যমী হন। ঢাকায় তখন বিদেশি গণমাধ্যমের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি ছিলেন। নিজামুদ্দীন তাঁদের প্রতিদিনই জানাতেন গণহত্যার সবশেষ খবর।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিনিধি ম্যাক ব্রাউনসহ অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকদের তিনি মুক্তিবাহিনীর কর্মকাণ্ডসহ গণহত্যার তথ্য ও ছবি সংগ্রহের জন্য নিয়ে যেতেন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে ও দেশের নানা স্থানে। এ ধরনের কাজের জন্য প্রায়ই তাঁকে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে। তিনি তখনো কৌশলে বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যুদ্ধের তথ্য সরবরাহ করতে থাকেন। কড়া সেন্সরশিপের মধ্যেও তিনি দেশের অভ্যন্তরের ঘটনা ও যুদ্ধের যাবতীয় বর্ণনা নিয়মিত বিবিসি-কে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশি গণমাধ্যমকে জানাতেন, যা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।

যথেষ্ট সাবধানতার পরও পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যান নিজামুদ্দীন আহমদ। মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা, ভারতে অবস্থানরত রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগসহ বিভিন্ন কারণে জেনারেল রাও ফরমান আলীর দফতরে
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে দু’বার ডেকে নেওয়া হয়।

রাও ফরমান আলী দু’বারই নিজামুদ্দীনকে সতর্ক করে বলেন, কোনো অবস্থাতেই যেন গণহত্যার খবর বিদেশি
সংবাদমাধ্যমে পাঠানো না হয়। এর অন্যথা হলে তাঁকে সমস্যায় পড়তে হবে। নিজামুদ্দীন আহমদ জিজ্ঞাসাবাদ থেকে ফিরে দু’বারই ছোটভাই মিনহাজউদ্দিনকে সব কথা খুলে বলেন। তবে দু’বার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি
হয়েও তিনি দমে যাননি। আগের মতোই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে নিজের কাজ করে যেতে থাকেন। তাঁর এই সাহসিকতায় অবাক হতেন বিদেশি সহকর্মীরাও।

বিবিসি’র একজন ধারাভাষ্যকার এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমরা অবাক হয়ে ভাবতাম তিনি (নিজামুদ্দীন) কি ভয়ানক বিপদেও ঝুঁকি নিয়ে আমাদের জন্য খবর পাঠিয়ে চলছেন। আমরা তাঁকে সতর্ক করে দেওয়ারও চেষ্টা করেছি।

নিরাপত্তার কারণে নিজামুদ্দীন আহমদ তখন রাতে বাসায় না ফিরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে থাকতেন। একসময় তাঁকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পশ্চিম পাকিস্তানে ডেকে পাঠানো হয়। পিপিআইয়ের আরেকজন সাংবাদিক ও একজন ব্যাংকারকেও ডাকা হয়েছিল। নিজামুদ্দীন কৌশলে সেখানে যাননি। কিন্তু বাকি
দু’জন যেতে বাধ্য হন। এরমধ্যে ব্যাংকারকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করে পাকিস্তান সরকার। এ ঘটনার কারণেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজামুদ্দীনকে তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে।

শত প্রতিকূলতার মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন নিজামুদ্দীন আহমদ। দেখতে-দেখতে কয়েকমাস পেরিয়ে গেছে। ডিসেম্বরের শুরুতেই ভুটান আর ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলো বাংলাদেশকে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জেলাকে মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
দেশের অধিকাংশ জেলাতেই ওড়ছে সোনালি রঙে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা লাল সবুজ পতাকা।

কয়েক শ’ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি পেতে যাচ্ছে নিজের দেশ, বাংলাদেশ। এমনি সময়ে নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের এদেশীয় দালাল রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের নিয়ে করল হীন চক্রান্ত। সিদ্ধান্ত নিল, এদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক যাঁরা বেঁচে থাকলে নতুন দেশটি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে; তাঁদের হত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো।

এমন সিদ্ধান্তের পর ১৯৭১-এর ১২ই ডিসেম্বর এলো সেই কালোদিন। যেদিন তুলে নেওয়া হলো অকুতোভয় সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদকে। সেদিন সকাল থেকেই ঢাকার আকাশে একটা প্লেন চক্কর দিচ্ছিল।
বিদেশিদের উদ্ধারে এসেছিল প্লেনটি। কিন্তু ঢাকা বিমানবন্দরে ভারতীয় বিমান হামলায় রানওয়ে হয়ে উঠেছিল ব্যবহার অনুপযোগী। ফলে বিমানটি নামতে পারছিল না।

ঠিক সে সময় পুরান ঢাকার ১২ নম্বর রোকনপুরের বাসায় (কবি নজরুল সরকারি কলেজের পেছনে) বসে খবর টাইপ করছিলেন নিজামুদ্দীন। খুব দ্রুতই খবরগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাঠাতে চাইছিলেন তিনি। এক ধরনের উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। তাই বারবার উঠে বাইরে গিয়ে রাস্তার ওপর নজর রাখছিলেন। এভাবে একটানা দুপুর একটা পর্যন্ত কাজ করলেন তিনি। দুপুর একটার দিকে তিনি শেষবারের মতো টাইপরাইটার ছেড়ে উঠে স্ত্রীকে
ডাকলেন। জানালেন, ক্ষুধা পেয়েছে। স্ত্রীর ডাকনাম রেবা, পুরোনাম কোহিনুর আহমদ।

রেবা দ্রুত খাবার টেবিল সাজালেন। ছেলেমেয়েদের ডাকলেন খাবার খেতে। নিজামুদ্দীন পরিবারের সকলকে নিয়ে একসাথে খেতে পছন্দ করতেন। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য সবদিন তা করতে পারতেন না। তাই সুযোগ পেলে সকলে একসাথে খেতেন। টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেবা দেখলেন, নিজামুদ্দীন ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁর ক্লান্তির কথা ভেবে রেবা আর ডাকলেন না। কিছুক্ষণ পর নিজামুদ্দীন নিজেই ঘুম থেকে উঠে ছেলে বাপ্পীকে নিয়ে খেতে বসলেন। কিছুক্ষণ পর দুই মেয়ে এলো তাদের সদ্য সিএসপি অফিসার খোকন মামাকে নিয়ে। শ্যালকের সঙ্গে রসিকতা
করতে-করতে খেতে শুরু করেন নিজামুদ্দীন।

সপরিবারে খাচ্ছেন নিজামুদ্দীন। এমন সময় সদর দরজায় শিকল ঝাঁকানোর শব্দ পাওয়া গেল। শিকলের শব্দে সকলে চমকে উঠলেন। রেবা ভেবেছিলেন হয়তো কাজের ছেলেটা এসেছে। কিন্তু কাজের মেয়ে চিৎকার করে বলল, আম্মা মিলিটারি আসছে।

খাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় কাজের মেয়ের কথায়। রেবা দৌঁড়ে বারান্দায় যান। দেখলেন, উঠানে খাকি পোশাক পরা দু’জন লোক। একজনের চোখে সবুজ সানগ্লাস। কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা। এ দৃশ্য দেখে রেবা আতঙ্কিত হন। কি করবেন বুঝতে পারেন না। স্বামীকে কোথায় লুকাবেন সেই ভাবনায় অস্থির হলেন।

নিজামুদ্দীন আহমদ ভাবলেন, পালাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। তাছাড়া পালিয়ে জীবন বাঁচানোর মানসিকতাও তাঁর নেই। বরং ঘরের মেয়েদের রক্ষা করার উপায় ভাবলেন তিনি। দরজায় আর্মি আর আলবদর বাহিনীর লোকজন দাঁড়িয়ে। বাইরে থেকে তারা নিজামুদ্দীনের নাম ধরে ডাকলে তিনি শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

প্রথমেই তারা নিজামুদ্দীনের আইডেন্টিটি কার্ড চাইল। তিনি কার্ড দেখালেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নাম বলার সাথে-সাথে ওরা বন্দুক তাক করে বলল, হ্যান্ডস-আপ। নিজামুদ্দীন আহমদ তখন তাদের বললেন, তাকে হাত ধুয়ে আসতে দেওয়ার জন্য। তারা তাকে হাত ধোয়ার সময় দিলো না। বাবাকে আটক করতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে ছেলেমেয়েরা। বড় মেয়ে শামানা ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলে ‘আল্লা’ কে ডাকতে থাকে।

তা দেখে পাকিস্তানি আর্মির একজন তার বুকে বন্দুক তাক করে বলে, ‘আল্লাহ মাৎ বলো’। পাশে দাঁড়ানো খোকনের দিকে তাকিয়ে আর্মিরা তার পরিচয় জানতে চাইল। নিজামুদ্দীন জানালেন, খোকন সিএসপি অফিসার। একথা শুনে অল্প বয়সী ছেলেটি বলল, ‘উসকো ছোড় দো’। এরপর সামনে পেছনে দু’টি রাইফেল উঁচিয়ে ধরে নিজামুদ্দীন আহমদকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে গেল।

আর্মির জিপ গাড়িটা ছিল সদর রাস্তায়। রেবা পেছন-পেছন গিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাঁর ভাই খোকন তাকে বাধা দিলেন। গাড়ির কাছে গিয়ে নিজামুদ্দীনের গায়ে থাকা গেঞ্জি ছিঁড়ে তাঁর চোখ বাঁধা হলো। এরপর রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে তাঁকে গাড়িতে তোলা হলো।

অকুতোভয় সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদকে নিয়ে গেল ঘাতকরা। তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম অত্যাচারে থেমে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ। যিনি যুদ্ধের সব খবর বিবিসি’র মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানাতেন, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম সকালে তিনিই খবরের শিরোনাম হলেন।

স্বাধীনতার পর তাঁর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে পত্রপত্রিকায় যথেষ্ট লেখালেখি হয়েছে। বিবিসি’র মার্কটালীসহ দেশ-বিদেশের অনেক সাংবাদিক তাঁকে খুঁজে ফিরেছেন। কিন্তু কেউ-ই সফল হননি।

শহীদ নিজামুদ্দীন আহমদকে যখন তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তখন বড় মেয়ে শামানা নিজাম সিলভিয়ার বয়স ১১ বছর। বর্তমানে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। ছোট মেয়ে শারমিন রীমার বয়স একাত্তরে ছিল নয়বছর। বিয়ের পর স্বামী মুনীরের পরকীয়ার বলি হন তিনি। বিচারে রীমার স্বামী, প্রখ্যাত চিকিৎসক মেহেরুন্নেসার ছেলে মুনীরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

আর সবার ছোট ছেলে শাফকাত নিজাম বাপ্পী। বর্তমানে তিনি স্ত্রী-কন্যা নিয়ে ঢাকাতেই বাস করছেন। শহীদ নিজামুদ্দীন আহমদের স্ত্রী কোহিনুর আহমদ রেবা ১৯৯৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

নিজামুদ্দীন আহমদের স্ত্রী কোহিনুর আহমদ সেদিনের ঘটনার মর্মস্পর্শী দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন স্মৃতি:১৯৭১-এ। (রশীদ হায়দার সম্পাদিত, পুনর্বিন্যাসকৃত প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)। তিনি লিখেছেন, ‘দেখেই আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। তারা যেন সাপের মতো হিসহিস করছে।…পালিয়ে যাওয়ার তো কোনো পথ নেই! ওরা সদর দরজায়। আমি ভাবছি কোন দিক দিয়ে গেলে নিজাম সাহেবকে আড়াল করা যায়, আর তিনি ভাবছেন ঘরের মেয়েদের যেন কিছু করতে না পারে। তাই ওরা যখন ডাক দিল, তখন আমি বাধা দেওয়ার আগেই তিনি বেরিয়ে এলেন।…ওরা আইডেনটিটি কার্ড দেখতে চায়। উনি দেখান।…তিনি নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে বুকে বন্দুক ধরে বলল হ্যান্ডস আপ। ইংরেজিতে তিনি বললেন, আমাকে হাত ধুয়ে আসতে দাও। কিন্তু দিল না। ততক্ষণে আমার ছেলেমেয়েদের কান্নার রোল শুরু হয়ে গেছে। আমার বড় মেয়ে আল্লাহ আল্লাহ করছে। ওর বুকে বন্দুক ধরে বলল—“আল্লাহ মাৎ বালো”।’ এরপর ঘাতকেরা সামনে-পেছনে বন্দুক ধরে নিজামুদ্দীন আহমদকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মূল লেখা: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিক। সম্পাদক, মো. শাহ আলমগীর, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট। 
error: দুঃখিত!