৯ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
শুক্রবার | সকাল ১০:৪১
মুন্সিগঞ্জের ৩টি আসনে বিএনপি মোকাবেলায় ‘প্রভাবশালী’ প্রার্থী চায় আ. লীগ
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ, ১৬ নভেম্বর, ২০২২, শিহাব আহমেদ (আমার বিক্রমপুর)

গেল ১৪ সেপ্টেম্বর আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে রাজপথে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সারাদেশে বিভাগীয় শহরে গণ সমাবেশ করছে বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও সংগঠনের সম্মেলনসহ নানারকমের পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠ দখলে রেখেছে। গেল ২১ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জেও বিএনপি বেশ বড়সড় ভাবে তাদের শক্তি প্রদর্শন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সামনের নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করছেন, বিএনপির বর্তমান রাজপথের অবস্থান ও সংঘাতের রাজনীতির বিকল্প ভাবনা সামনের নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের অংশগ্রহণমূলক করতে সরকারকে বাধ্য করতে ভূমিকা রাখবে।

মুন্সিগঞ্জের ৩টি আসন টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে স্বশরীরে ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং দ্বিধাহীনভাবে ভোট প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত হলে মুন্সিগঞ্জের ৩টি আসনেই ফলাফল আওয়ামী লীগের বিপরীতে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু ঢাকার পাশ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ এই জেলার আসনগুলো হারাতে চায় না আওয়ামী লীগ। তাই ইতিমধ্যেই মুন্সিগঞ্জে মাঠ জরিপের কাজ শুরু করেছে দলটি। এছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারাও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে মুন্সিগঞ্জকে। তারা মনে করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত সামনে ঘনিয়ে আসবে বিএনপি রাজপথে তত শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করবে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতে নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখতে সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচি ও কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগও চাইছে মূল দলসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বর্তমান সংসদ সদস্যদের মাঠে রাখতে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, মূল দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী, সাধারণ ভোটার, ব্যবসায়ী, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। তাদের মতামত নিচ্ছেন। বিকল্প ও সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করছেন তারা।

জানা গেছে, সেক্ষেত্রে নির্বাচনের সময় এলাকায় প্রভাব রাখতে পারা, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক রেখে তাদের রাজপথে সক্রিয় রেখে ভোট সংগ্রহে ভূমিকা রাখা ও যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষম পরীক্ষিত ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দেয়ার কথা ভাবছে আওয়ামী লীগ।

৩ আসনের হালচাল

মুন্সিগঞ্জ জেলায় বর্তমানে সংসদীয় আসনের সংখ্যা ৩টি। ২০১৮ সালের ইসির হিসাব অনুযায়ী মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলার ২৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মুন্সিগঞ্জ ১ আসনে ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ৭৬০ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৭২ জন। জেলার লৌহজং ও টংগিবাড়ী উপজেলার ২৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মুন্সিগঞ্জ ২ আসনে ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ৫ হাজার ৯৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৩ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৪ জন। মুন্সিগঞ্জ সদর ও গজারিয়া উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মুন্সিগঞ্জ ৩ আসনে ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ১৬ হাজার ৬৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ১২জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৯ জন।

মুন্সিগঞ্জ ১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের মিত্র বিকল্পধারার মাহি বি চৌধুরী। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের মিত্র বিকল্প ধারাকে ছেড়ে দিলে বিএনপির প্রার্থী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের বিপরীতে ৬৫.০৯% শতাংশ ভোট পেয়ে বিকল্প ধারা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাহি বি চৌধুরী।

এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি (ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন), ১৯৯৬ জুন (সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন) ২০০১ ও ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া উপ-নির্বাচনে আসনটি বিএনপির দখলে ছিলো।

এই আসনটিতে ২০০৮ সালে মোট ভোটের ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ও বিকল্প ধারার প্রার্থী একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ভোট বর্জন করলে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুর মোহাম্মদকে হারিয়ে ৯৬ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বর্তমানে অসুস্থতাজনিত কারনে এলাকায় আসেন না।

মুন্সিগঞ্জ ২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। এমিলি প্রথম ১৯৯৬ সালে সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৃতীয়বারের মত আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়ে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহার সাথে ৭০.৩৯% শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।

২০০৮ সালে মোট ভোটের ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহাকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। ২০১৪ সালে বিএনপি ভোট বর্জন করলে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন আহমেদকে হারিয়ে প্রায় ৯৪ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি (ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন), ১৯৯৬ জুন (সপ্তম) জাতীয় সংসদ নির্বাচন) ও ২০০১ সালে আসনটি বিএনপির দখলে ছিলো।

মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের মৃণাল কান্তি দাস। ২০১৪ সালে বিএনপি ভোট বর্জন করলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মত আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়ে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল হাইয়ের বিপরীতে ৭৫.২৩% শতাংশ ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মৃণাল কান্তি দাস।

২০০৮ সালে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এম শামসুল ইসলামকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এম ইদ্রিস আলী। এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি (ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন), ১৯৯৬ জুন (সপ্তম) জাতীয় সংসদ নির্বাচন) ও ২০০১ সালে আসনটি বিএনপির দখলে ছিলো।

তৃণমূলকে মাঠে রাখার চ্যালেঞ্জ

জেলায় বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী সংগঠনগুলোর তৎপরতার বিপরীতে নেতাকর্মীদের মাঠে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারছেন না সংসদ সদস্যরা।

বিশেষ করে গেল ২১ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুরে পুলিশের উপর বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের মত ঘটনা ঘটলেও শক্ত করে প্রতিবাদ দেখাতে পারেননি জেলার সংসদ সদস্যরা। এতে ক্ষুদ্ধ হয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।

এর আগে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালের দিন হেফাজতের নেতাকর্মীরা নির্বিচারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুট, অগ্নিসংযোগ ও সিরাজদিখান থানার ওসির উপর হামলার ঘটনা ঘটালেও সেখানেও শক্ত কোন প্রতিবাদ দেখা যায়নি। তবে ঘটনার ২ দিন পর জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন মুন্সিগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাস।

গত বছরের ২ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জ সদরে হেফাজত নেতা মুফতি নূর হোসাইন নূরানী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মুন্সিগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাসের ভাতিজা আপন দাসের নাম ধরে বক্তব্য ও ৬ মাসের মধ্যে সরকার পতনের হুমকি দিলে ৪ এপ্রিল ‘শেখ হাসিনার প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও সাম্প্রদায়িক উস্কানির মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পায়তারা করায়’ ‘বিক্ষোভ সমাবেশ’ কর্মসূচি দেয় মুন্সিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগ। কিন্তু পরদিনই সেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামে বড় ভূমিকা রাখেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সারাদেশে এখন উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এখন বাড়িবাড়ি গিয়ে ভোটারদের বোঝানোর সময়। কিন্তু বর্তমান সংসদ সদস্যদের সাথে মূল দলের নেতাকর্মীদের সাথে দূরত্ব রয়েছে। এর ফলে তাদের ডাকে আগের মত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে নামছেন না। তারা বলেন, যে কোন নির্বাচনে দলের সহযোগী ও ভাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো যেমন- ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, যুব মহিলা লীগ, তাঁতী লীগ, শ্রমিক লীগ, মৎস্যজীবী লীগ, কৃষক লীগ ইত্যাদি নেতাকর্মীরা বড় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বর্তমানে মুন্সিগঞ্জে এই কমিটিগুলোর নেতাকর্মীদের সাথে সংসদ সদস্যদের দূরত্ব রয়েছে। সংসদ সদস্যরা এখনই দলের নেতাকর্মীদের সাথে দূরত্ব কমাতে না পারলে এর প্রভাব পড়বে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তাই মুন্সিগঞ্জে সংসদ সদস্যদের সাথে দলের নেতাকর্মীদের দূরত্বের বিষয়টিও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা।

error: দুঃখিত!