২৫শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
শনিবার | সকাল ৭:৩৪
Search
Close this search box.
Search
Close this search box.
নাম মুক্তমঞ্চ, উদ্বোধনের চারমাসে খোলেনি একদিনও
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ, ১৫ নভেম্বর ২০২৩, শিহাব আহমেদ (আমার বিক্রমপুর)

মুন্সিগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক কাজী নাহিদ রসুলের পরিকল্পনা ও জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় শহরের উত্তর কোটগাঁও এলাকায় ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক মোঘল দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ইদ্রাকপুর কেল্লা ঘেষে নির্মাণ শেষে চলতি বছরের জুলাইতে উদ্বোধন হয় ‘মুজিববর্ষ মুক্তমঞ্চ’ নামের একটি মুক্ত মঞ্চ।

দেশের অন্যান্য মুক্তমঞ্চের মত এখানেও অনায়াসে যে কেউ গান-কবিতা, ভাষণ-বক্তৃতা বিতর্ক করতে পারবে- বসে উপভোগ করতে পারবে। শুরুতে এমনটা শোনা গেলেও বাস্তবে এখনো এরকম দৃশ্যের দেখা মেলেনি। উদ্বোধনের পর চলতি নভেম্বরে ৪ মাস পেরোতে চলেছে। কিন্তু একদিনের জন্যও উন্মুক্ত থাকেনি এই মুক্তমঞ্চ।

এতে, সাংস্কৃতিক কর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে নাগরিকরাও উন্মুক্ত বিনোদনের জায়গাটিকে অবরুদ্ধ রাখার প্রতিবাদ করেছেন। এ নিয়ে তারা জেলা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন।

জানা যায়, চলতি বছরের ১৩ জুলাই শহরের কোটগাঁও এলাকায় ইদ্রাকপুর কেল্লা ও বঙ্গবন্ধু ম্যুরালের দক্ষিণ পাশে এই মুক্তমঞ্চের উদ্বোধন করেন ওই সময়ের জেলা প্রশাসক কাজী নাহিদ রসূল। এর দশদিন পরই তিনি অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যান। তিনি চলে যাওয়ার পর জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন মো. আবুজাফর রিপন।

মুক্তমঞ্চটি উদ্বোধনের সময় জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়, মঞ্চের সামনে নির্মিত ৯টি সিড়িতে একসাথে প্রায় দেড় শতাধিক দর্শক বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন। তাছাড়া মূল মঞ্চের সামনে কাঁচ দিয়ে অ্যাকোরিয়াম বানানো হয়েছে যাতে রাতের বেলা মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন আবহ তৈরি হয়।

এই মুক্ত মঞ্চের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জবাসী তাদের ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ পাবে। কিন্তু বাস্তবে চলতি নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে কোন অনুষ্ঠান আয়োজন দুরে থাক মানুষ বসারও সুযোগ পায়নি।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, মঞ্চটি চারপাশ থেকে গেট-লোহার জ্বাল দিয়ে আটকানো।

জানা গেছে, জেলায় নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত শতাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। যারা মঞ্চ নাটক, গান-কবিতা, আবৃত্তি-বিতর্কসহ নিয়মিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আয়োজন করে থাকে। মুক্ত মঞ্চটি মুক্ত থাকলে তারাও যেমন এসব অনুষ্ঠান পরিবেশন করতে পারবে দর্শকরাও এখানে বসে তা উপভোগ করতে পারবে।

অন্যদিকে, শহরে রয়েছে অসংখ্য সামাজিক সংগঠন। রয়েছে শতায়ু সংঘ, ডায়াবেটিস রোগীদের সমিতি ইত্যাদি যারা ভোর সকালে ইয়োগাসহ হালকা শারিরীক কসরত করে থাকেন। এরাও কোনদিন সুযোগ পায়নি মুজিববর্ষ মুক্তমঞ্চ বা ইদ্রাকপুর কেল্লার সামনে গড়ে উঠা এই অংশটি ব্যবহারের।

ইদ্রাকপুর কেল্লা ঘেষে নির্মিত ‘মুজিববর্ষ মুক্তমঞ্চ’। ছবি: আমার বিক্রমপুর।

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু ম্যুরালের সামনে যে গেটটি রয়েছে সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে কয়েকজনকে। শুধুমাত্র কোন দিবস এলে গেট খুলে দেয়া ও ভেতরের গাছ-গাছালিতে পানি ছিটানো তাদের দায়িত্ব। এছাড়া সারাবছর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গেটটিকে তালাবদ্ধ করে রাখার কাজটি তারাই পালন করেন। জেলা প্রশাসনের নির্দেশ ছাড়া গেট খোলার অনুমতি তাদের নেই বলে জানান গেটের দায়িত্বে থাকা একজন।

এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ খালেদা খানম বলেন, আমরা অবশ্যই চাই এই মুক্তমঞ্চটি মুক্ত করে দেয়া হোক। শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে এটির যে অবদান রাখার কথা তা রাখুক। কোন সংগঠন বা ব্যক্তি চাইলেই মুক্ত মঞ্চটি ব্যবহার করতে পারছে না। তাছাড়া বিকাল-সন্ধ্যায় উন্মুক্ত পরিবেশে এখানে বসার সুযোগও নেই নাগরিকদের। অথচ সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিলো জায়গাটি উন্মুক্ত থাকবে। সুস্থ ও নির্মল পরিবেশের সাথে বিনোদনের আবহ তৈরি হবে। বিকাল- সন্ধ্যায় বা অবসরে শহরবাসীর সুস্থ বিনোদনকেন্দ্র হয়ে উঠবে ইদ্রাকপুর কেল্লা ঘেষা এই অংশটি।

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউল ইসলাম হিরু বলেন, মুক্তমঞ্চ একেবারে উন্মুক্ত করে রাখা হলে জায়গাটির অপব্যবহার হতে পারে। ময়লা-আবর্জনায় সৌন্দর্য্য নষ্ট হতে পারে। তাই হয়তো নিরাপদে রাখতে এটিকে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তবে, আমাদের প্রত্যাশা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করলে তারা এটি যথাসময়ে খুলে দিবে।

জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সুজন হায়দার জনি বলেন, মুন্সিগঞ্জের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের জন্য সংস্কৃতি কমীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিলো একটি সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি করার। তার পাশাপাশি বড় পরিসরে একটি মুক্ত মঞ্চেরও দাবি ছিলো দীর্ঘদিনের। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করা হলেও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দের সাথে এ ব্যাপারে কোন আলোচনা বা সমন্বয় করা হয়নি। এবং এই মঞ্চটি যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে সেদিনও কোন সাংস্কৃতিক কর্মীদের জানানো হয়নি। জানানো বা না জানানো বড় বিষয় নয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা সবসময়ই কাছ করেছে আগামীতেও কাজ অব্যাহত রাখবে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে নাম দেয়া হয়েছে মুক্তমঞ্চ কিন্তু এটি অবরুদ্ধ রাখা হচ্ছে কেন? মঞ্চে যদি চর্চা না থাকে তাহলে সেই মঞ্চ সংস্কৃতি বিকাশে কোন কাজে আসবে না। এ কারণে আমি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানাবো, মুক্তমঞ্চটিকে সত্যিকারার্থেই মুক্ত করে সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ দেয়া হোক।

গতকাল সরেজমিনে মুক্তমঞ্চটির সামনে গেলে দেখা হয় স্থানীয় মোহাম্মদ সুরুজ মিয়ার সাথে। তিনি আরও কয়েকজনকে নিয়ে মুক্তমঞ্চের আবডালে লুডু খেলছিলনে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, উদ্বোধনের পর মাঝেমধ্যে গেট খুলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখানে আসেন কিন্তু আজ পর্যন্ত এখানে কোন অনুষ্ঠান হতে দেখেননি। এ নিয়ে অন্যদের মত আক্ষেপ রয়েছে তারও।

শহরের বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শহরের কোথাও উন্মুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে না। ফলে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তারা যাচ্ছে আড়ালে-আবডালে শহর সংলগ্ন মোল্লারচর বা চরকিশোরগঞ্জের বিভিন্ন রেষ্টুরেন্টে। এতে একদিকে যেমন তারা স্বাস্থ্যের জন্য বিরুপ প্রভাব ফেলে এরকম খাবার গ্রহণ করছে অন্যদিকে বেশ কিছু রেষ্টুরেন্টের গোপন কক্ষে সময় কাটিয়ে তারা বাড়ি ফিরছে। ফলে, পড়ালেখার পাশাপাশি চারিত্রিক অবক্ষয়ের সম্মুখীন হচ্ছে তারা। ইদ্রাকপুর কেল্লা ঘিরে যেসকল স্থাপনা রয়েছে তাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানে একটি উন্মুক্ত পরিবেশ উপহার দেওয়া গেলে তা শহরবাসীর জন্য হবে আশীর্বাদস্বরুপ।

মুক্তমঞ্চটি উন্মুক্ত করে দিতে কোন পদক্ষেপ নেয়া হবে কি না এ বিষয়ে গতকাল জানতে চাইলে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আবুজাফর রিপন কোন মন্তব্য করেননি।

ইদ্রাকপুর কেল্লার সৌন্দর্য্যহানি

মুন্সিগঞ্জের ৩৬৩ বছরের পুরোনো মোঘল স্থাপত্য ইদ্রাকপুর কেল্লা। বাংলার সুবাদার ও সেনাপতি মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। ১৯০৯ সালে স্থাপনাটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটির সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় সবসময়ই সরব দেখা গেছে জেলার সুধী সমাজকে।

পুরোনো কাচারি সড়ক থেকে ইদ্রাকপুর কেল্লার বর্তমান চিত্র। ছবি: আমার বিক্রমপুর।

জেলার আইকনিক এই স্থাপনার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া পুরোনো কাচারি সড়ক থেকে এক সময় ইদ্রাকপুর কেল্লা স্পষ্টত চোখে পড়তো। চাইলে সড়ক থেকে দাড়িয়ে ছবিও তোলা যেত। দূর থেকে যারা আসতেন সড়ক থেকেই তাদের চোখে পড়তো ইদ্রাকপুর কেল্লা।

কিন্তু বর্তমানে কেল্লা ঘেষে বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণের ফলে চোখের আড়ালে চলে গেছে কেল্লাটি।

অন্যদিকে, প্রশ্ন উঠেছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটিকে ঘিরে নির্মাণ করা এসব স্থাপনা প্রত্ম আইন মেনে করা হয়েছে কি না।

এ বিষয়ে প্রত্নতন্ত অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এটি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।

আড়ালে মাদকসেবিদের আড্ডা!

ইদ্রাকপুর কেল্লার দক্ষিণ পাশে মূল সড়কের পাশে গড়ে উঠা স্থাপনাগুলোকে যেভাবে অঘোষিত ‘সংরক্ষিত এলাকা’ করে রাখা হয়েছে তাতে মনে হতে পারে জায়গাটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

খালি চোখে কেল্লার আশপাশে নিরাপত্তা বেড়েছে বলে মনে হলেও আসলে তা নয়। রাস্তার পাশের এদিকটা সংরক্ষিত মনে হলেও কেল্লার প্রধান গেটের পাশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু ম্যুরালের পেছন দিকে অনায়াসে যাতায়াত করা যায়। এছাড়া লোহার জ্বালি কেটে মুক্তমঞ্চের ভেতরে ঢোকার পথও তৈরি করে রেখেছে বখাটেরা।

বঙ্গবন্ধু ম্যুরালের পেছন দিকে লোহার জ্বালি কেটে সুরঙ্গ বানিয়েছে মাদকসেবিরা। সেখানেই দেখা গেল অসংখ্য ফেনসিডিলের খালি বোতল। ছবি: আমার বিক্রমপুর।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে জায়গাটি বখাটেদের গোপন আড্ডাখানায় পরিণত হচ্ছে। গতকাল ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সকলের চোখের আড়ালে গাছের আবডালে আড্ডায় ব্যস্ত স্থানীয় স্কুলের ছেলে-মেয়েরা। বঙ্গবন্ধু ম্যুরালের পেছনের অংশে টিন দিয়ে বানানো ছোট একটি ঘরের পাশে দেখা গেল মাদকদ্রব্য ফেনসিডিলের অসংখ্য খালি বোতল পরে রয়েছে। এসব বিষয়ে যেন একেবারেই উদাসীন দায়িত্বশীলরা।

error: দুঃখিত!