২৮শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
শনিবার | রাত ১২:৩৯
বিলুপ্তির পথে বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৩, শিহাব আহমেদ (আমার বিক্রমপুর)

হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জ জেলা। এই জেলায় প্রাচীন বাংলার অনেক নিদর্শন এখনো আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

বিভিন্ন পূজার প্রতিমাও তৈরি করেন এখানকার মৃৎশিল্পীরা। ছবি: আমার বিক্রমপুর।

যুগে যুগে কালে কালে অনেক সমৃদ্ধ সভ্যতার জন্ম হয়েছে প্রাচীন এ জনপদে। বিক্রমপুরের প্রাচীন নিদর্শনের একটি হলো মৃৎশিল্প। বিভিন্ন সময় এই শিল্প নানা রূপ রঙে আমাদের সামনে বৈচিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানকার মৃৎশিল্পীরা তাদের অসম্ভব শৈল্পিক ও কল্পনা শক্তি দিয়ে তাদের দক্ষতা ও মাধুর্য দিয়ে চোখ ধাঁধানো সব কাজ করে থাকেন।

এখানকার তৈরি বিভিন্ন সাইজের মাটির ব্যাংক বিক্রি হয় বিভিন্ন হাট-কাজারে। ছবি: আমার বিক্রমপুর।

প্রাচীনকাল থেকে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার পাল বংশীয় পরিবারের লোকেরা বংশ পরম্পরায় তাদের যত্নশীলতা দিয়ে কাজ করছেন মৃৎশিল্প নিয়ে। তবে আগে শীতের মৌসুমে যে ব্যস্ততা দেখা যেত মৃৎশিল্পীদের সেই আগের মত এখন আর ব্যস্ততা নেই তাদের।

এক সময় বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি মাটির হাড়ি-পাতিল, বাসন, তৈজসপত্র, পিঠার হাড়ি, খই/মুড়ি ভাজার হাড়ি, কলসি, সরা, ফুলের টব, খেলনা ইত্যাদি বিভিন্ন পণ্য দেশের নানা প্রান্তে পাওয়া যেত। তবে এখন শুধুমাত্র জেলাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের বাজার।

করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে মেলা ও পূজা পার্বণ আয়োজন সীমিত হয়ে যাওয়ায় এখন কোনরকমে টিকে আছে এই শিল্প। অন্যদিকে মাটির দাম বেড়ে যাওয়ায় শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তারা। আগে যেখানে জেলায় এই পেশার সাথে জড়িতদের সংখ্যা ছিলো ৬ শতাধিক। এখন সেটি কমে নেমে এসেছে দুইশ’তে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে প্রতি ৫ কেজির দইয়ের পাতিলের দাম ছিলো ১৫ টাকা, ৩ কেজির দাম ছিলো ১২ টাকা ও ২ কেজির দাম ছিলো ১০ টাকা। বর্তমানে ৫ কেজি দইয়ের পাতিলের দাম ১২ টাকা, ৩ কেজি পাতিলের দাম ১০ টাকা ও ২ কেজি পাতিলের দাম ৮ টাকায় নেমে এসেছে।

বর্তমানে মাটির ব্যাংক, দইয়ের পাতিল ও বিভিন্ন পূজায় ব্যবহৃত মূর্তি বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন এই অঞ্চলের মৃৎশিল্পীরা। ছবি: আমার বিক্রমপুর।

এককালে মৃৎ শিল্প রাজা, বাদশা, জমিদার ও অভিজাত পরিবারে নিত্য দিনের ব্যবহার্য বস্ত ছিল। সন্ধ্যা প্রদীপ কিংবা সকালের পান্তা-মরিচ খাওয়া পর্যন্ত এই শিল্পের ব্যবহার বেশ উল্লেখ করার মতো। প্রযুক্তি অগ্রগতি আর বিজ্ঞানের জয়ের ফসল হিসাবে কমদামে অধিক টেকসই সিলভার, মেলামাইন, প্লাস্টিক বিভিন্ন সামগ্রীর দাপটে মৃৎ শিল্পের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে।

মুন্সিগঞ্জ জেলার মৃৎ শিল্পের ইতিহাস শত বছরের। এক সময় এখানকার কুমারদের হাতে তৈরি মাটির জিনিস পত্রের ব্যাপক চাহিদা ছিল। স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলার হাট-বাজারেও পাওয়া যেত এই মৃত শিল্প। কিন্তু কালের বিবর্তনে মাটি তৈরি হাড়ি-পাতিলের চাহিদা থাকলেও বিলুপ্তির পথে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎ শিল্প। এরই মধ্য জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কুমার অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে ফেলেছেন। এখন তাদের কেউ স্বর্ণের কাজ, বিদেশে কেউবা কামারের কাজ করছেন।

তবে, আশার কথা হলো, এখনো জেলার টংগিবাড়ী, সিরাজদিখান ও শ্রীনগর উপজেলার কুমার বা পালরা বংশ পরম্পরায় এ কাজ করে আসছেন। এসব অঞ্চলের মৃৎশিল্পিরা তাদের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া মাটির কাজ করে এখনো টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

সিরাজদিখানের দক্ষিণ রায়পুরা এলাকার মৃৎশিল্পী ঠাকুর পাল (৭৫) বলেন, আগে এই পেশায় অনেক আয় ছিলো। মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় করা যেত। তবে এখন মাটির দাম বেড়ে যাওয়া ও আধুনিকতার ছোয়ায় পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

মৃৎশিল্পী বাবুল পাল (৫৫) বলেন, আমি ৩০-৩৫ বৎসর যাবৎ এ পেশার সাথে জড়িত। আগে গ্রামে-গঞ্জের হাটে, মেলায় মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসের চাহিদা ছিলো অত্যধিক। তবে এখন আর নেই। বিয়ের অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র দইয়ের পাতিল সরবরাহ করে আমাদের ব্যবসা টিকে আছে। আর মাটির ব্যাংকের চাহিদা রয়েছে কোনরকমে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) মুন্সিগঞ্জের উপ-ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, করোনার আগে এই শিল্পটি চাঙা ছিলো। তবে করোনা পরবর্তী সময়ে এখন এটি বিলুপ্তির পথে। তবু বিভিন্ন মেলায় আমরা তাদের আসতে আমন্ত্রণ করি। এতে তাদের কিছু ব্যবসা হয়।

তিনি বলেন, মৃৎশিল্পীরা যদি চায় আমরা তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো। পাশাপাশি তারা যোগাযোগ করলে তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে।

জেলা কর্মসংস্থান ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মৃৎশিল্পীরা আমাদের কাছে ঋণের আবেদন করলে আমরা যাচাই-বাছাই করে ঋণ দেয়ার চেষ্টা করবো।

error: দুঃখিত!