৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
সোমবার | দুপুর ১:১০
নিবন্ধ: বাংলা আমার মায়ের ভাষা
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, (আমার বিক্রমপুর)

আমাদের জাতীয়তাবাদ চেতনার উদ্ভবের অন্যতম প্রেক্ষাপট বায়ান্ন। বায়ান্ন আমাদের প্রতিবাদী করেছে, বায়ান্ন মাথা উচু করে বাঁচতে শিখিয়েছে। কিভাবে বুলেট বোমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে হয় তা শিখিয়েছে বায়ান্ন।

বায়ান্ন আমাদের শিখিয়েছে শোষকদের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে কিভাবে রাজপথে স্লোগান তুলতে হয়। বৃহৎ স্বার্থের জন্যে নিজ স্বার্থ বিসর্জন দিতে শিখিয়েছে বায়ান্ন। জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদাশীল হতে শিখিয়েছে বায়ান্ন। ভাষার জন্যেও যে জীবন দিতে হতে পারে তা বিশ্বকে দেখিয়েছে বায়ান্ন। বায়ান্নই একাত্তরের স্বপ্ন দেখিয়েছে।

বায়ান্ন থেকেই পেয়েছিলাম স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা। শোষকদের শৃঙ্খল ভেঙে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে বায়ান্ন। যে বায়ান্ন ছোট বাচ্চার প্রথম হাটতে শেখার মতো বাঙ্গালি জাতিকে রুখে দাড়াতে শিখিয়েছে, যে বায়ান্ন আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, সে বায়ান্নকেই-না ভুলতে শুরু করেছি আমরা!

আবারো নিজেদের আবদ্ধ করে ফেলছি পরাধীনতার শৃঙ্খলে! কি করে ভুলে যেতে পারি আমরা রফিক, সালাম, বরকতদের আত্মত্যাগ? রফিক সালাম বরকত ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে এই স্লোগান তুলেই আমরা আজ আমাদের দায়িত্ব শেষ করছি।

কিন্তু যে ভাষার জন্যে তাদের আত্মত্যাগ, যে ভাষার জন্যে তাদের সংগ্রাম, যে ভাষার জন্যে আমার ভাইদের স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছিল সারাদেশ, সে ভাষাকে কতটুকু মর্যাদা দিতে পেরেছি আমরা?,সে ভাষাকে কতটুকু ভালোবাসতে পেরেছি আমরা? বাংলা আমার মায়ের ভাষা, এই মায়ের ভাষাকে কি তার যথাযথ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছি আদো?

ভাষাকে কেন্দ্র করে কতশত গল্প, কত ত্যাগ, কত সংগ্রাম, কত বিসর্জন। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছিলেন জহির রায়হানের মতো গুনীজনরা, যিনি দিয়েছিলেন আরেক ফাল্গুনের প্রেরণা। বায়ান্ন থেকে শুরু একাত্তরে শেষ, শেষ হয়েও তবু হইলোনা শেষ। “বাংলা আমার মায়ের ভাষা, বাংলা জন্মভূমি” কথাটি আজ মুখেই মানায় ভালো, কাজে নয়। এখন আমাদের শিক্ষিত সমাজ কে কতটুকু ইংরেজি শিখতে পারলো তা নিয়ে ব্যাস্ত। দোষটা যতটা না আমাদের শিক্ষার্থীদের তার থেকে বেশি আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থার।

ভালো বাংলা জানাটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভালো ইংরেজি জানা কেননা ইংরেজিটা ভালো করে না শিখলে যে ভবিষ্যৎটাই অন্ধকার। এই ভাবনাটাই আমাদের ইংরেজির দিকে ঠেলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এখনকার সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম গুলো যেনো ইংরেজিতে না হলে চলেইনা।এই ধরুণ ব্যাক্তি মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় গুলো, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইস্টওয়েস্ট, নর্দান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইত্যাদি নাম গুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভিতরে কিভাবে মগজ ধোলাই হচ্ছে।

আমরা শিক্ষিত সমাজ কথা বলার সময় একটু ইংরেজি না বল্লে যেনো খ্যাত খ্যাত লাগে তাই বাংলা আর ইংরেজি একসাথে করে আমরা এক নতুন বাংলিশ ভাষার জন্ম দিয়েছি।

আরো অছে খাবারের দোকানগুলোতে একটা সময় দেশীয় নাম গুলো শোভা পেতো কিন্তু এখন আর সেদিন নেই এখন কিচেন, ডাইন, কুজিন ব্যাবহার না করলে যেনো চলেই না।

আধুনিকতা দেখাতে যেয়ে বাংলাকে আমরা প্রতিনিয়ত খ্যাত বানিয়ে ফেলছি। আমাদের সংস্কৃতিকে তথাকথিত আধুনিকতা যে কিভাবে ধ্বংস করছে সেটা দেখার কেউ নেই, সেটা ভাবারও যেনো কেউ নেই।

আমাদের বিচার বিভাগের রায়গুলো পর্যন্ত ইংরেজিতে দিয়ে থাকে। ছেলে মেয়েকে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ানোর প্রবণতা অতিতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সময়ে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যারা বাংলাকে খ্যাত মনে করে, আধুনিকতা বলতে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতি, ভাষা, চালচলনকেই বুঝে থাকে।

ভাষার অপব্যবহার, অবমুল্যায়ন, ভাষাকে অবহেলার এরকম হাজারো উদাহরণ রয়েছে, আশেপাশে একটু চোখবুলালে খুব সহজেই তা আমাদের দৃষ্টি গোচর হবে।

তবে কথা হলো ভাষাকে ভালোবেসে, ভাষাকে আকড়ে ধরে, ব্যাক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় সকল পর্যায়ে ভাষার সঠিক চর্চা করে,ভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখিয়ে, নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষা করেই যে আমরা উন্নত, আধুনিক জাতিতে পরিনত হতে পারি, বিশ্বের সামনে নিজেদের মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে তুলে ধরতে পারি সেদিকে আমাদের কোনো কর্নপাত নেই।

উদাহরণ হিসেবে আমরা চিনকে দেখতে পারি তাদের খুব বেশি মানুষ ইংরেজি জানেনা এবং এর পিছনেও ছুটেনা তবুও তারা বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনীতির দেশ এবং আগামীতে যে তারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।আমরা নিজেদের জাতিসত্বাকে গুরুত্ব দেইনা যা জাতি হিসেবে আমাদের অবনত করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

যতদিন না জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের আত্বমর্যাদাশীল করতে পারবো। যতদিন না মা, মাটি, মাতৃভূমি, ভাষা,সংস্কৃতি নিজেদের মাঝে লালন করতে পারবো ততদিন আমাদেরকে অন্যদের দিকে মাথা ঝুঁকেই থাকতে হবে। আসুন মায়ের ভাষাকে সম্মান করা শিখি, ভাষার চর্চা ছড়িয়ে দেই সকল পর্যায়ে। আবারো বায়ান্ন ফিরে আসুক সকলের মাঝে।

ভাষার অপব্যাবহার, অবমূল্যায়ন হতে বিরত থেকে, ব্যক্তি হতে রাষ্ট্রীয় সকল পর্যায়ে ভাষার সঠিক চর্চাই হোক আগামী দিনের পথচলার মূলমন্ত্র। ভাষাকে তার যথাযথ যায়গায় অধিষ্ঠিত করাই হোক বায়ান্নর প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন।

লেখক: নিজাম উদ্দিন (সাগর) শিক্ষার্থী: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়৷

error: দুঃখিত!