১১ই ডিসেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
সোমবার | বিকাল ৪:১০
গুরুদায়িত্ব সোহাগ-জাকিরের কাঁধে
খবরটি শেয়ার করুন:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসও প্রাচীন। ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস আমাদের জন্য গৌরব করার মতো ইতিহাস। সম্প্রতি দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৮তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে কাউন্সিলরদের গোপন ভোটের মাধ্যমে সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন নির্বাচিত হয়েছেন, যা ছাত্ররাজনীতির জন্য ইতিবাচক। নানা নেতিবাচক চিত্রের মাঝেও এ নির্বাচন নতুন প্রজন্মকে আশান্বিত করে। অন্যান্য ছাত্রসংগঠন যেখানে কাউন্সিলরদের ভোট ছাড়াই নেতা নির্বাচন করে, সেখানে ছাত্রলীগের এই দৃষ্টান্ত অবশ্যই অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। শুধু ভোট নয়, নেতৃত্বের জন্য ছাত্রলীগ যেভাবে সর্বোচ্চ ২৯ বছর বয়স ও ছাত্রত্ব বজায় থাকার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে, অন্যান্য ছাত্র সংগঠনে সেটাও বিরল।

ছাত্রলীগের সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জোর দিয়েছেন যে, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বচ্ছ ও সৎ ভাবমূর্তি, মেধা ও যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়। যাতে করে তারা ছাত্রলীগের ঐতিহ্য, গৌরব ও ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে পারে। গত এক দশকে সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ভ্রাতৃসংগঠন ছাত্রলীগের বিভিন্ন কীর্তি অবশ্য চোখে পড়ে।

বিশেষ করে উচ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে যে কার্যক্রম হয়েছে তা উল্লেখযোগ্য। আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ছাত্ররাজনীতি ছাত্রদের বদলে অছাত্রদের হাতে নিয়ন্ত্রণ, মূলবোধ ও আদর্শিক জায়গা থেকে স্খলন এবং পর সহিংষতা,  শ্রদ্ধাবোধের অভাব এবং শিক্ষাঙ্গনে অনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ ছাড়া আগে যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি ছিল, এখন সেখানে বুদ্ধি ও আদর্শের বদলে স্থান করে নিয়েছে অস্ত্র। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেওয়া আমাদের কাছে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যে ছাত্রের হাতে আজ কলম থাকার কথা ছিল; সে ছাত্রের হাতে যদি অস্ত্র থাকে তাহলে সে জাতির জন্য কী উপহার দেবে। আগে ছাত্ররাজনীতিতে মেধাবী ছাত্রকে বেশি মূল্যায়ন করা হতো অথচ আজ যে যত বেশি দাঙ্গা ও অস্ত্রের মহড়া দিতে পারে, সে তত বড় নেতা হতে পারে। আর এই জন্য ছাত্ররাজনীতিতে মেধাবী ছাত্ররা দূরে সরে এসেছে। যার ফলে ছাত্ররাজনীতি কলমের বিপরীতে অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এই দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু, জাকসু, রাকসুর মতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগঠন বিদ্যমান ছিল। যার ফলে একদিকে সেগুলো যেমন ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ছিল, তেমনি ছাত্রদের সকল সমস্যার সমাধান, শিক্ষাকেন্দ্রিক আন্দোলন, জাতির ক্রান্তিণলগ্নে অবদান রাখতে প্রয়াসী ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই ধরনের কোনো ছাত্ররাজনীতির অস্তিত্ব না থাকার কারণে ছাত্ররাজনীতি আজ অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন ও বল্গাহীন হয়ে পড়েছে। ছাত্রলীগের নতুন সভাপতি-সম্পাদককে এখন এই লাগাম টেনে ধরতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে ছাত্ররাজনীতির ভাবমূর্তি। পুনরুদ্ধার করতে হবে ছাত্রলীগের সাড়ে ছয় দশকের অতীত গৌরববাহী ভাবমূর্তি। তাদের মনে রাখতে হবে, ছাত্রলীগের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে নতুন নেতৃত্বকে আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।

বিশেষত, ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দল ও সংঘাত পরিহার করে ছাত্ররাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। চাঁদাবাজি-দখলবাজির সেই পুরোনো ধারা এড়িয়ে চলতে হবে। ক্যাম্পাসগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন পুনরায় ফিরে না আসে সেই দিকনির্দেশনা সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দিতে হবে। ছাত্ররাজনীতি যে আদর্শ নিয়ে জন্ম হয়েছিল তা বর্তমানে বাস্তবায়নে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ছাত্ররাজনীতিতে কিছু ছাত্র মূল পরিচয় ভুলে নিজের স্বার্থকে বড় করে অন্যে ছাত্রের বুকে ছুরি চালাতে দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ছাত্ররাজনীতির জন্ম হয়েছিল সমাজের মৌলিক দাবি পূরণ, তাদের অধিকারসচেতন করা, জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রসারিত করা এবং মননশীলতার বিকাশ ঘটানো।

বর্তমান ছাত্ররাজনীতিতে আদর্শের অনুপস্থিতি প্রকট। অথচ স্বাধীনতার আগে ছাত্ররাজনীতি ছিল আদর্শভিত্তিক এবং সে আদর্শ ছিল দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করা। দেশের ছাত্ররাজনীতি এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থনির্ভর হয়ে পড়েছে। বস্তুত তারও আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে, এমনকি নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও এ দেশের ছাত্রসমাজ কতটা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত আড়াই দশকের গণতান্ত্রিক শাসনামলে আমরা দেখেছি তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠন বা একই সংগঠনের উপদলগুলো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। আসলে ছাত্ররাজনীতি যখন অবৈধ উপার্জন ও ক্ষমতার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সংঘাত ও কোন্দলই অনিবার্য হয়ে ওঠে। নিজের সংগঠন ছাড়াও সার্বিক ছাত্ররাজনীতির বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের দায় ও দায়িত্ব অন্যদের তুলনায় নিঃসন্দেহে বেশি।

দেশের মানুষ সত্যি সত্যিই ছাত্রলীগের পরিবর্তন দেখতে চায়। দেখতে চায়, মাগুরায় মায়ের গর্ভে থেকেই গুলি খাওয়া ওই শিশু ও তার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে ছাত্রলীগের নতুন কমিটি। দেখতে চায়, ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সারা দেশের হাজারও ছাত্রলীগ সদস্যের আর কেউ যেন এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড না করতে পারে, তা নিশ্চিত করা। এবারের ছাত্রলীগের সম্মেলন চলাকালে সংগঠনটির অনেক কর্মীই বলেছেন, যাঁরা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে সামনের সারিতে থেকে কাজ করেছেন, তাঁদের অবশ্যই পদ পাওয়া উচিত।

বিএনপিকে মোকাবেলা করাই হয়তো ছাত্রলীগের কাছে সবচেয়ে বড় দলভক্তি বলে মনে হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে হলে ছাত্রলীগকে দৃষ্টি দিতে হবে আরো দূরে, আরো অনেক কিছুর দিকে। এই অনুধাবন করা খুব জরুরি যে, যেই দলই ক্ষমতায় থাকুক; দেশের অধিকাংশ মানুষই অপেক্ষা করতে থাকে ভালো কিছুর জন্য। মানুষের এই অপেক্ষার অবসান ঘটানোই নেতার কাজ। ছাত্রলীগ যত পরিচ্ছন্ন হবে, মানুষের এই প্রত্যাশা যতটা পূরণ পারবে সংগঠনটি আরো বেশি শক্তিশালী হবে। প্রধানমন্ত্রীও হয়তো এমনটাই চান।

তবে শুধু পরিচ্ছন্ন রাজনীতিই নয়, প্রধানমন্ত্রীর হয়তো চাওয়া আরো অনেক বেশি। গত বছর তরুণ উদ্যোক্তাদের একটি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। লেখাপড়া শেষ করে চাকরির জন্য দুয়ারে দুয়ারে ধরনা না দিয়ে নিজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং অন্যকেও সুযোগ করে দিতে হবে। ছাত্রদের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যাশা করেন নতুন নতুন উদ্যোগ, যা সমাজের সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু ছাত্রলীগ যে সে পথে না হেঁটে খেই হারিয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রীও জানেন। এ কারণেই সংগঠনটির নবনির্বাচিত কমিটিকে গণভবনে পেয়ে তাঁকে বলতে হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু কথা।

প্রধানমন্ত্রী ছাত্ররাজনীতির ওপর দেশের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার জন্য ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। শুভেচ্ছা বিনিময়ে তিনি বলেছেন, ‘ছাত্ররাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে প্রত্যেকে বিশ্বাস করে, তোমরা জাতিকে কিছু দিতে পারো।’ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এভাবেই অন্যদের পথ দেখাতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সভাপতি-সম্পাদকের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা ফেরানো এবং ছাত্রলীগের হারানো গৌরব ফিরিয়ে নিয়ে আসা। আমরা মনে করি, ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব সেই গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিতে দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক মুক্তির জন্য ‘শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি’র যে মূল উদ্দেশ্য তা বাস্তবায়ন করা। আর এ জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের সর্বাত্মক আন্তরিকতা, সততা ও একতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

কিন্তু সবকিছুই যে হঠাৎ করেই বদলে যাবে তা আশা করা যায় না। ছাত্রলীগও হয়তো হঠাৎ করেই বদলাবে না। কিন্তু মানুষ দেখতে চায়- চেষ্টা। মাগুরার গর্ভাবস্থায় শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি নিঃসন্দেহে মানুষকে চরম হতাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সম্মেলনে সংগঠনের বদনাম হয় এমন কিছু না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নেত্রীর সেই নির্দেশ আমলে নেননি। সম্মেলনের আগে থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে ছাত্রলীগের কর্মীদের দৌরাত্ম্য লক্ষ করা গেছে। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও চাঁদাবাজিরও ঘটনা ঘটেছে বলে গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু মানুষ দেখতে চায়, ছাত্রলীগের মধ্য থেকেই এর প্রতিবাদ উঠবে। ছাত্রলীগই চেষ্টা করবে দেশের আইনশৃঙ্খলার সমস্যার উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে। মানুষের এই প্রত্যাশাকে সম্মান জানানোই হবে ছাত্ররাজনীতির ওপর আস্থা ফেরানোর প্রথম পদক্ষেপ।

-বেলাল হোসাইন রাহাত

error: দুঃখিত!