১১ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
বৃহস্পতিবার | সকাল ১১:২০
গণমাধ্যম স্বাধীনতা: কাটছাঁটের বলি সুরক্ষা বলয়?
খবরটি শেয়ার করুন:
324

মুন্সিগঞ্জ, ৩০ অক্টোবর ২০২৫, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

লেখক: শিহাব আহমেদ, সাংবাদিক

স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান ক্ষমতাসীন পরিবর্তনকামী সরকারের অন্যতম একটি সাধু উদ্যোগ ছিলো গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার নীতিগুলো কার্যকরে আরও জনবান্ধব ভূমিকায় সাংবাদিকদের বিচরণ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা, প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিহ্নিতকরণ, স্বার্থকেন্দ্রীক চাপ/হুমকির ধরন ও ব্যাপকতা নির্ণয়, সাংবাদিকতার জন্য বাধা ও হুমকি সৃষ্টিকারী আইনসমূহ চিহ্নিত করা ও প্রতিকারের উপায়সহ স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থাকার উপায় নির্ধারণ করতে একটি স্বাধীণ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা।

উদ্যোগটি সাংবাদিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল এবং আগ্রহের কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশন ৯০ দিনের মধ্যে ১৮০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল।

যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি প্রসঙ্গ হচ্ছে- ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন করা ও ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা’য় অধ্যাদেশ জারি করা।

উদ্বেগজনক যে, প্রতিবেদন প্রকাশ বা জমা দেয়ার সাত মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কোন প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

অন্যদিকে, সাংবাদিকতার ওপর প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিকূল পরিবেশের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

তবে, সরকার সংশ্লিষ্টরা আশ্বাস দিচ্ছেন তারা অন্তত কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করে যাবেন।

তা ভালো- তবে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যাচ্ছে- সংস্কার কমিশনের ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণীত মূল খসড়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা প্রাথমিক খসড়ায় বাদ দেয়া হয়েছে।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত খসড়াটি সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত খসড়ায় সেই উদ্দেশ্য কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। মূল কমিশন যে জায়গায় সাংবাদিকদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করতে চেয়েছিল, সেখানে মন্ত্রণালয়ের খসড়ায় দেখা যাচ্ছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও উপধারা বাদ দেওয়া হয়েছে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত খসড়ার ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীদের সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের। কিন্তু কমিশনের প্রস্তাবিত দুটি উপধারা এখানে অনুপস্থিত। একটি উপধারায় স্পষ্টভাবে বলা ছিল- কোনো ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করতে পারবেন না, যা সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করে। অন্য উপধারায় উল্লেখ ছিল- সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তেমনি ৪ নম্বর ধারায়ও দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিকদের গোপনীয়তা, গৃহ ও পারিবারিক নিরাপত্তা রক্ষার কথা থাকলেও কমিশনের প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপধারা তথ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বাদ পড়েছে। ওই ধারাগুলিতে বলা হয়েছিল, সাংবাদিকের জীবন, স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা যাবে না; বলপ্রয়োগ করে তাঁর গৃহে প্রবেশ, তল্লাশি বা সম্পদ জব্দও করা যাবে না।

একইসঙ্গে উল্লেখ ছিল- আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, যা সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মর্যাদা, স্বাধীনতা, পরিবার বা সম্পদের ক্ষতি ঘটায়।

কমিশন বলেছিল, সাংবাদিক যেন কোনো ব্যক্তি, সংস্থা, কর্তৃপক্ষ, কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারি কর্মচারী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভয়ভীতি বা জোরপূর্বক শারীরিক বা মানসিক চাপমুক্ত অবস্থায় স্বাধীনভাবে এবং অনুকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটি সরকার নিশ্চিত করবে।

অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়ায় এই মৌলিক উপধারাটিই বাদ দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে, কমিশনের খসড়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ছিল এই যে-যদি কোনো সাংবাদিক সরল বিশ্বাসে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন এবং তাতে কারও ক্ষতি হয়, তবে ভিন্ন উদ্দেশ্য প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার মামলা করা যাবে না। তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত খসড়া থেকে এই পুরো ধারাটি সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি, কমিশনের আরেকটি প্রস্তাব ছিল-আদালত আরোপিত অর্থদণ্ডকে সাংবাদিকের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করতে পারবেন এবং এই অর্থ দণ্ডিত ব্যক্তির কাছ থেকে আদায় করা হবে। এই আর্থিক সুরক্ষার বিধানটিও মন্ত্রণালয় বাদ দিয়েছে।

এছাড়া, কমিশনের খসড়ায় বলা হয়েছিল, এই অধ্যাদেশের অধীনে দায়ের করা অভিযোগ ও মামলা সহকারী পুলিশ সুপারের নিচে নন, এমন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দ্বারা তদন্ত হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত খসড়ায় সেই তদন্তের মান নিশ্চিত করার এই উপধারাটিও রাখা হয়নি।

এসব ধারা ছিল সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষার মূল ভিত্তি; এগুলো বাদ দিলে অধ্যাদেশটি তার কার্যকারিতা ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতার ভীত হারাবে। মোটকথা, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সাংবাদিকদের স্বাধীনতা রক্ষায় যে মজবুত কাঠামো তৈরি করতে চেয়েছিল, মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই সুরক্ষাবলয়কে কার্যত ভেঙে দিয়েছে।

এছাড়া এ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন খোদ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ। দৈনিক প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন- ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মনে হচ্ছে, মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এই সংস্কারপ্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো আশঙ্কা করছেন, এই আইন কার্যকর হলে তাঁদের কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের খসড়ায় যে ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে আইনের আর বাস্তব কোনো প্রয়োজন থাকবে না।’

আমার মন্তব্য হচ্ছে- মূল খসড়ায় থাকা এই ধারাগুলো শুধু কাগজে-কলমের বিষয় নয়; এগুলো ছিল রাষ্ট্র কর্তৃক সাংবাদিকদের জন্য তৈরি করা নৈতিক ঢাল। এ সুরক্ষাগুলো বাদ দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত পেশাদার সাংবাদিকতার পথকে আরও দুর্গম করে তোলা উচিৎ হবে না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখা যায়- নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস কিংবা ভারতের কেরালা রাজ্যে সাংবাদিক নিরাপত্তা আইন কেবল ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, তথ্যের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেখানে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা বা শারীরিক হুমকির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্তের বিচার এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত আইনে এ ধরনের স্পষ্ট প্রক্রিয়া অনুপস্থিত।

সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’-এর মূল লক্ষ্যই অপূর্ণ থেকে যাবে। কারণ, গণমাধ্যম কোনো সরকারের প্রতিপক্ষ নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেকের প্রতিধ্বনি।

তাই সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার আইনি কাঠামো দুর্বল করা মানে শুধু একটি পেশাকে নয়, গণতন্ত্রের মেরুদণ্ডকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

কাজেই, সরকারের উচিত মন্ত্রণালয়ের এই কাটছাঁটের ঊর্ধ্বে উঠে কমিশনের মূল প্রস্তাবনাকে হুবহু ফিরিয়ে আনা। কারণ, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা নয়, বরং জাতির বিবেককে সুরক্ষিত করা।