ভাষাবিজ্ঞানী, বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আজ ১২ আগস্ট বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির গ্রন্থেমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে একদল সন্ত্রাসী হুমায়ুন আজাদকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হুমায়ুন আজাদ সুস্থ হয়ে ওঠেন। ওই বছরের ৭ আগস্ট একটি গবেষণা বৃত্তি নিয়ে তিনি জার্মানি যান। এর পাঁচ দিন পর ১২ আগস্ট মিউনিখের নিজ ফ্ল্যাটে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

প্রথাবিরোধী লেখক হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন আজাদের জন্ম বিক্রমপুরের রাঢ়িখালে যেটি এখন মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার অন্তর্গত।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং সভাপতিও ছিলেন। হুমায়ুন আজাদের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ষাটের বেশি। এর মধ্যে আছে বাংলা ভাষা (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), অলৌকিক ইস্টিমার, ৫৬ হাজার বর্গমাইল, সবকিছু ভেঙে পড়ে, রাজনীতিবিদগণ, একটি খুনের স্বপ্ন, পাক সার জমিন সাদ বাদ, রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা, নারী (নিষিদ্ধ ১৯৯৫), প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে, আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র, বাঙলা ভাষা (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না প্রভৃতি।

হুমায়ুন আজাদ অকুতোভয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, সামরিক শাসনের/একনায়কতন্ত্রের বিরোধিতা, নারীবাদী বক্তব্য এবং একই সঙ্গে নিঃসংকোচ যৌনবাদিতার জন্যে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত অভীষ্ট তাঁর সাহিত্যকে প্রবলভাবে প্রভাবান্বিত করেছিল।

১৯৭৬ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বাংলা ভাষায় সর্বনামীয়করণএই গবেষণাপত্র পরবর্তীকালে ১৯৮৩ সালে প্রোনমিনালাইজেশান ইন বেঙ্গলি নামে বাংলা একাডেমি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

১৯৬০-এর দশকে হুমায়ুন আজাদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র তখন পশ্চিমের ভাষাবিজ্ঞানী চম্‌স্কি-উদ্ভাবিত ‘সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণ’ (transformational-generative grammar (TGG)) তত্ত্বটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য হুমায়ুন আজাদ এই তত্ত্বের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার রূপমূলতত্ত্ব তথা বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে বাংলার ভাষাবিষয়ক গবেষণায় আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূত্রপাত করেন। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল ‘Pronominalization in Bengali’ (অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ)। পরবর্তীতে এটি একই শিরোনামের ইংরেজি বই আকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এর পর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্বের ওপর বাক্যতত্ত্ব নামে একটি বাংলা বই প্রকাশ করেন। একই সালে তিনি বাঙলা ভাষা শিরোনামে দুই খণ্ডের একটি দালীলিক সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যাতে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা সংকলিত হয়। এই তিনটি গ্রন্থ বাংলা ভাষাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসাবে বিবেচিত হয়।

তিনি পরবর্তী কালে তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞানের উপর দু’টি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক লেখেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত অকাল মৃত্যুর কারণে তাঁর এই আগ্রহ বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: দুঃখিত!