বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং থেকে শুরু করে ৩২ রাষ্ট্রনায়ক/সংগঠনকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে ‘রিপোর্টার্স স্যান ফ্রন্টিয়ার্স’ (সংক্ষেপে আরএসএফ, ইংরেজিতে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার)। বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আরএসএফের ওই তালিকায় বাংলাদেশের জঙ্গিগোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) নাম রয়েছে।

আরএসএফ বলেছে, একের পর এক ব্লগার হত্যা ও স্বাধীন মতপ্রকাশবিরোধী ভূমিকার জন্য ২০১৩ সাল থেকেই এবিটি সংবাদমাধ্যমের শত্রু তালিকায় আছে। ২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে এই জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশে ব্লগারদের লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। ২০১৫ সালে অন্তত চারজন ব্লগার এবিটির হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

শত্রু তালিকায় স্থান পেয়েছে ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটও (আইএস)। ২০১৪ সাল থেকে ইরাক ও সিরিয়ায় তিনজন বিদেশিসহ অন্তত কয়েক ডজন সাংবাদিককে হত্যা করেছে আইএস। সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলার জন্য আফগানিস্তানের তালেবান ও পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইও আছে শত্রু তালিকায়।

আজ যখন বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে, তখন সারা বিশ্বে সাংবাদিকতা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বাণীতে বলেছেন, মুক্ত গণমাধ্যম শান্তি, ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকারের জন্য অপরিহার্য। স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যে প্রবেশাধিকার ছাড়া কোনো গণতন্ত্রই সম্পূর্ণ নয়।

সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলায় উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ইউনেসকোর হিসাব অনুযায়ী গত বছর সারা বিশ্বে প্রায় ১০০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। শত শত সাংবাদিক কারাগারে। গণমাধ্যমকর্মীরা যখন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তখন এর মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকেই।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রাক্কালে গত বুধবার লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে আয়োজিত সেমিনারে লর্ড ইমস বলেন, গণমাধ্যমকর্মীরা কাজ করতে গিয়ে অহেতুক চাপ বোধ করলে কোনো গণমাধ্যমই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। কখনো কখনো এই চাপ স্বতঃপ্রণোদিত। বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চাকরি হারানোর ভয় কাজ করে। এ ছাড়া কোনো কোনো গণমাধ্যম মালিকের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পেশাদার সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ কমছে।

আরএসএফের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে সারা বিশ্বেই সাংবাদিকদের স্বাধীনতার হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। সাব সাহারা অঞ্চলে স্বাধীন সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে সাংবাদিকদের সঙ্গে হয়রানি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সাংবাদিকরা প্রাতিষ্ঠানিক আক্রমণের শিকার হচ্ছে। লাতিন আমেরিকায় গণমাধ্যমের ওপর কর্তৃত্ববাদ ও অসত্য চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব পড়েছে গণমাধ্যমের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হচ্ছেন।

আরএসএফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এশিয়ার ‘অগণতান্ত্রিক’ দেশগুলোতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তথ্য আটকে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, থাইল্যান্ডে স্বাধীন সাংবাদিকতা এখন কষ্টসাধ্য। সম্পাদকীয় স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে ‘সেল্ফ সেন্সরশিপের’ শিকার হচ্ছে পাপুয়া নিউ গিনি ও টোঙ্গার গণমাধ্যমগুলো।

নির্বাচন, আন্দোলন, সংঘাতের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরেছে আরএসএফ। আগের বছরের চেয়ে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসূচকে চার ধাপ নেমে ১৫০-এ এসেছে। আরএসএফের মতে, রাজনীতি কঠিন হয়ে যাওয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: দুঃখিত!