ঘরোয়া ক্রিকেটে অনিয়ম, বিস্ফোরক তথ্য জাফরউল্লাহ শারাফাতের

অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট বিশেষ করে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগ, প্রথম বিভাগ ও দ্বিতীয় বিভাগে আম্পায়ারিং নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বহু পুরনো। পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিং ছাড়াও নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়া নিয়েও বিভিন্ন সময় সমালোচিত হয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেট।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পরোক্ষ ইঙ্গিতে আম্পায়াররা কোনো কোনো বিশেষ দলের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়ে খেলার ফলে প্রভাব বিস্তার করেন। সেসব অনিয়ম নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফরুল্লাহ শারাফাত। এ ছাড়াও ঘরোয়া ক্রিকেটের অনিয়ম নিয়ে দিয়েছেন বিস্ফোরক তথ্য।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমরা খুব ভালো করে জানি, আমাদের প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগ লিগে কী ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে। বিতর্কিত আম্পায়ারিং, ম্যাচ রেফারি, স্কোরার—তারা সিন্ডিকেট করে বিশেষ বিশেষ দলের পক্ষে যে ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। যারা একেবারেই মফস্বল এলাকা থেকে আসে, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, মুস্তাফিজ, মাশরাফি হওয়ার জন্য এসে এই ধরনের অনিয়ম যখন ঘরোয়া ক্রিকেটে লক্ষ করে তখন কিন্তু তাদের স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ফলে আমরা যেসব কথাগুলো প্রায়ই বলে থাকি, কেন আমাদের পাইপলাইন দুর্বল, কেন আমাদের সাপ্লাই লাইন দুর্বল? দেখেন আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে এই ধরনের ঘটনাগুলো যদি নিয়মিত হতে থাকে, তাহলে পাইপলাইন কিংবা সাপ্লাই লাইন কীভাবে শক্তিশালী হবে?’

ঘরোয়া ক্রিকেটে সচরাচর কী কী ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে, তারও বেশ কয়েকটি তথ্য দিয়েছেন জাফরুল্লাহ। তিনি জানান, এসব লিগে পয়েন্ট কেনাবেচা থেকে শুরু করে আম্পায়ার পর্যন্ত কেনাবেচা হয়ে থাকে। এসব অনিয়মের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে প্রভাব বিস্তার করেন বিসিবির কর্মকর্তারা।

আসন্ন নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য দল নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন জাফরুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত
কতিপয় কর্মকর্তার ইন্ধনেই এসব অনিয়ম হয়ে থাকে বলে জানান এই ধারাভাষ্যকার। তার ভাষ্য, ‘আপনি হয়তো খুব অবাক হয়ে যাবেন, সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পয়েন্ট কেনাবেচা হয়। এমনকি আম্পায়ার পর্যন্ত বেচাকেনা হয়ে থাকে। আরও অবাক করার মতো বিষয়, সাতটির মতো ক্লাব যেখানে অনেক বড় বড় ক্রিকেট সংগঠক কিন্তু অর্থায়ন করে থাকে। এটার মূল কারণ হলো, আগামীতে বোর্ডের যে নির্বাচন হবে সেখানে যারা কাউন্সিলর কিংবা এসব ক্লাবে যারা ভোটার তারা যেন তাকে ভোট দেন। এ জন্য তাদের দলেক পক্ষে এই ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়ে থাকে।’

এসব অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ধরুন, একজন ব্যাটসম্যান ৪৫ কিংবা ৪৭ রান করতে সক্ষম হলেন। তখন আম্পায়ারের হাতে-পায়ে পর্যন্ত ধরতে হয় যে, তাকে যেন আর ৩টি রান করার সুযোগ দেওয়া হয়। অর্ধশত রানের যে মাইলফলক, সেটি যেন অন্তত স্পর্শ করতে পারে। আম্পায়ার তখনই তাকে জানিয়ে দেন, তুমি প্যাভিলিয়নের পথ ধরো। না হলে তোমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। কল্পনা করা যায়?’

এসব অনিয়মের চর্চা বন্ধ না হলে ক্রিকেটারদের উঠে আসার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন জাফরুল্লাহ। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বলেই এটা সম্ভব হচ্ছে। এসব ঘটনা থেকে যতদিন পর্যন্ত বিরত না থাকবে… আমরা যে প্রায়ই একটা কথা বলে থাকি যে, বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হবেই হবে। শেষ পর্যন্ত সেটি কিন্তু শুধু স্বপ্নই রয়ে যাবে।’

এ সময় আসন্ন নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য দল নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন জাফরুল্লাহ। চলমান বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) সৌম্য সরকার ফর্মে না থাকা সত্ত্বেও তাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তিন মাস পেরোতেই ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে সাব্বির রহমানকে দলে ফিরিয়ে আনায় নির্বাচকদের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই নয়, আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট বিপিএল সেখানেও কিন্তু তিনি (সৌম্য) ব্যর্থ। আপনি দেখুন, বিপিএলে যে দলটিতে যিনি খেলছেন সেখানেও কিন্তু গেল চার-পাঁচটি ম্যাচে (তিন ম্যাচ) তাকে একাদশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সাইড লাইনার হয়ে তিনি বসে থাকেন। এ রকম একজন অফফর্মে থাকা ক্রিকেটারকে কিসের ভিত্তিতে জাতীয় দলের স্কোয়াডে রাখা হলো তার কোনো ভিত্তি নেই। যারা নির্বাচকমণ্ডলী, যারা টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের এমন সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে যেন আর গ্রহণ করা না হয়।’

সাব্বিরের প্রসঙ্গ টেনে এনে জাফরুল্লাহ বলেন, ‘আরেকটা কথা বলি। নানা কার্যকলাপ, কেলেঙ্কারির কারণে যেগুলো আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে থাকি, সাব্বির রহমান তাকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হলো। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে তার বহিষ্কারাদেশ শেষ হবে। শাস্তির সেই মেয়াদটা শেষ হওয়ার আগে তাকে কীভাবে আবার দলে ডেকে নেওয়া হলো? কীভাবে স্কোয়াডে রাখা হলো? এটি কিন্তু অবাক বিস্ময়। যারা দর্শক-সমর্থক তারা কিন্তু তাকিয়ে রইল। আমি আশা করব, এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে ভবিষ্যতে তারা (নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্ট) বিরত থাকবে এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বার্থে, বাংলাদেশের স্বার্থে, বাঙালির স্বার্থে এই ধরনের অনিয়ম থেকে তারা বিরত থাকবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: দুঃখিত!